এয়ার ইন্ডিয়ার লোকসান টানতে গিয়ে লঙ্কাকাণ্ড সিঙ্গাপুরে! বিপুল অর্থ সাহায্য নিয়ে সংসদে চরম হাঙ্গামা

টাটা-মালিকানাধীন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার চরম আর্থিক সংকট এবার ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে সোজা উত্তপ্ত করে তুলল সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক ময়দান। বিপুল পরিমাণ লোকসান কাটিয়ে ওঠার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে তাদের বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১২,৫০০ কোটি টাকা) মূল্যের একটি বিশাল উদ্ধার প্যাকেজের (বেলআউট প্যাকেজ) দাবি জানানো হয়েছে। আর এই বিপুল পরিমাণ তহবিলের আবেদন ঘিরেই বর্তমানে সিঙ্গাপুরের সংসদে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও তুলকালাম কাণ্ড। সে দেশের বিরোধী দলের স্পষ্ট দাবি, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের (SIA) মাধ্যমে এয়ার ইন্ডিয়াকে অর্থ সাহায্য দিয়ে উদ্ধারের কোনো যুক্তিই নেই।
সিঙ্গাপুর সংসদে প্রতিবাদের ঝড়
সিঙ্গাপুর ওয়ার্কার্স পার্টির বিশিষ্ট সংসদ সদস্য (MP) কেনেথ তিয়ং বুন কিয়াত সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে এয়ার ইন্ডিয়াকে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা অর্থায়নের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। উল্লেখ্য, এয়ার ইন্ডিয়াতে এসআইএ-র প্রায় ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। আর এই এসআইএ-র সবথেকে বড় বা প্রধান শেয়ারহোল্ডার হলো সিঙ্গাপুর সরকারের বিনিয়োগকারী সংস্থা ‘টেমাসেক হোল্ডিংস’ (Temasek Holdings)।
এমপি কেনেথ তিয়ং দেশটির পরিবহন মন্ত্রী জেফরি সিও-কে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে আগামী ৮ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সংসদীয় অধিবেশনে এই বিষয়ে একটি স্পষ্ট মৌখিক জবাব তলব করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, সিঙ্গাপুরের কোনো সাধারণ করদাতা নাগরিক এয়ার ইন্ডিয়াকে আর্থিক সহায়তা দিতে বাধ্য নন। তাঁর জোরালো দাবি, এসআইএ যদি সত্যিই এয়ার ইন্ডিয়াতে বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে চায়, তবে তা সরকারের কোনো তহবিল বা টেমাসেকের টাকা দিয়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজেদের ব্যবসায়িক উদ্যোগে করা উচিত।
এসআইএ-র ব্যালেন্স শিটে বড় ধস
এয়ার ইন্ডিয়ার এই লাগাতার দুর্বল আর্থিক পারফরম্যান্স সরাসরি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সকে। এসআইএ তাদের প্রকাশিত প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফলেই একটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক লোকসানের কথা স্বীকার করেছে, যা ২০২২ সালের পর থেকে তাদের প্রথম ধাক্কা। এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে এই দুই বছরের অংশীদারিত্বের জেরে এসআইএ-র ইতিমধ্যে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অপারেশনাল লস বা পরিচালন লোকসান হয়েছে।
এর আগে এসআইএ ‘বিস্তারা’ বিমান সংস্থাকে এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে একীভূত করেছিল। এমনকি ২০২৪ সালে সংস্থাটি অতিরিক্ত ৮২২ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার বিনিয়োগও করেছিল। শুধু তাই নয়, গত মার্চ মাসে নিজেদের অংশীদারিত্বের শেয়ার রক্ষা করার জন্য তাদের আরও ১৬৭ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার পকেট থেকে ঢালতে হয়েছিল। বিমান সংস্থার এই ক্রমবর্ধমান ও লাগাতার খরচ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ঘুরে দাঁড়াতে লাগবে ৫ থেকে ১০ বছর!
এয়ার ইন্ডিয়াকে তার পুরোনো ছন্দে ফিরিয়ে আনা যে টাটা সন্সের (Tata Sons) কাছে কোনো জাদুকরি ব্যাপার নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৬ অর্থবর্ষে এয়ার ইন্ডিয়া এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের যৌথ লোকসান লাফিয়ে বেড়ে ২.৩৩ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরন নিজেই সংস্থার শেয়ারহোল্ডারদের সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এয়ার ইন্ডিয়াকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড় করাতে দীর্ঘ ৫ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা চরম অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর নেপথ্যে রয়েছে পুরোনো ও সেকেলে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো, প্রয়োজনীয় বিমানের যন্ত্রাংশ সময়মতো না পাওয়া, বিশ্ব বাজারে লাগাতার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। পাশাপাশি, ২০২৫ সালের জুনে আহমেদাবাদে ঘটা অনভিপ্রেত বিমান দুর্ঘটনাটিও এয়ার ইন্ডিয়ার সামগ্রিক কার্যক্রমে এক বিশাল বড় ধাক্কা দিয়েছে।
শেয়ারহোল্ডারদের মনেও দানা বাঁধছে প্রশ্ন
শুধু সিঙ্গাপুরের বিরোধী রাজনীতিবিদরাই নন, এই চুক্তি নিয়ে খোদ শেয়ারহোল্ডারদের অন্দরেও তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গত মাসেই সিকিউরিটিজ ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন (সিঙ্গাপুর) এয়ার ইন্ডিয়াকে ঠিক কী পরিমাণ তহবিল দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে এসআইএ-র কাছে বিস্তারিত স্পষ্টীকরণ চেয়েছিল। যদিও এসআইএ-র তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, এয়ার ইন্ডিয়া তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভারত বা এশিয়া কৌশলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এদিকে, ডিবিএস-এর (DBS) বিশিষ্ট বিশ্লেষক জেসন সামের মতে, এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষে লাভজনক সংস্থায় পরিণত হতে এখনও বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। বিদেশি অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, সিঙ্গাপুর সরকার হয়তো শেষ পর্যন্ত এই যুক্তি দেখাতে পারে যে, এসআইএ তাদের নিজস্ব ব্যালেন্স শিট ব্যবহার করছে, যা সরাসরি সাধারণ করদাতাদের বা টেমাসেকের তহবিলকে সরাসরি বিপদের মুখে ফেলছে না। তা সত্ত্বেও এই বিশাল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ নেই।