“শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা পুত্রবধূর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়!” ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ আদালতের, জানলে চোখ কপালে উঠবে

বিয়ের পর স্ত্রীকে শুধুই গৃহকর্ম করা কিংবা স্বামীর বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বে বেঁধে রাখা যায় না। বিয়ে কোনও মহিলার ব্যক্তিস্বাধীনতা, ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স হতে পারে না—একটি দাম্পত্য বিবাদ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ পেশ করল কর্ণাটক হাইকোর্ট। গত ২৪ আগস্ট দেওয়া এই রায় ঘিরে ইতিমধ্যেই আইনি মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।

ঠিক কী মামলা ছিল?
পারিবারিক আদালতের একটি নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এক ব্যক্তি। পারিবারিক আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে, ওই ব্যক্তিকে তাঁর স্ত্রী ও নাবালিকা মেয়েকে মাসিক ৯ হাজার টাকা (স্ত্রীকে ৫ হাজার এবং মেয়েকে ৪ হাজার টাকা) ভরণপোষণ দিতে হবে।

আদালতে স্বামীর মূল অভিযোগ ছিল, তাঁর স্ত্রী ঠিকমতো সংসারের কাজ করতেন না এবং বয়স্ক বাবা-মায়েরও দেখাশোনা করতেন না। এমনকি স্বামীর অনুমতি না নিয়েই স্ত্রী বারবার বাপের বাড়ি চলে যেতেন বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। অন্যদিকে, স্ত্রীর পালটা অভিযোগ ছিল, শ্বশুরবাড়িতে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বামীর মদ্যপান ও জুয়া খেলার অভ্যাস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

হাইকোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ:
মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি ড. চিল্লাকুর সুমলতার একক বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দেয়, একজন স্ত্রীকে কখনই ঘরের কাজের জন্য নিযুক্ত কোনো গৃহপরিচারিকার মতো দেখা যায় না। একইভাবে, স্বামীর বাবা-মায়ের দেখাশোনা করাও কোনো স্ত্রীর বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব হতে পারে না। বিচারপতির স্পষ্ট বক্তব্য, বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁদের নিজেদের সন্তান অর্থাৎ ছেলে বা মেয়ের। পুত্রবধূ বা জামাই সেই দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নেবেন কি না, তা সম্পূর্ণ তাঁদের নিজস্ব ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ কাউকে জোর করতে পারেন না।

এছাড়া, নিজের বাবা-মায়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য কোনো নারীকে কেন শ্বশুরবাড়ির অনুমতি নিতে হবে, সেই প্রশ্নও তুলেছে আদালত। বিচারপতির মতে, নিজের পিতৃগৃহে যাওয়া বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করার মতো একটি মৌলিক ইচ্ছার ক্ষেত্রে স্বামীর বা বাড়ির অন্য সদস্যের অনুমতি বাধ্যতামূলক—এমন ধারণা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

বিবাহিত সম্পর্কের সংজ্ঞা বদল:
আদালত আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, সংসারের কাজ কখনোই কেবল নারীর একক দায়িত্ব হতে পারে না। ঘরের কাজকর্ম নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত। স্ত্রীর ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা বা তাঁকে নিজের ইচ্ছামতো নাচাতে বাধ্য করার কোনো অধিকার স্বামীর নেই। একজন নারীর নিজের কেরিয়ার গড়ার, আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বজায় রাখার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ছিল, বিবাহ এমন কোনো সম্পর্ক নয় যেখানে একজন শুধু নিয়ন্ত্রণ করবেন আর অন্যজন অনুগত হয়ে তা মেনে চলবেন।

সব দিক বিবেচনা করে পারিবারিক আদালতের মাসিক ৯ হাজার টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশেই বহাল থাকে। বর্তমান বাজারদর ও মূল্যবৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে এই অর্থ খুব বেশি নয় বলে জানিয়ে স্বামীর করা রিভিশন পিটিশনটি খারিজ করে দিয়েছে কর্ণাটক হাইকোর্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *