‘মগনলাল মেঘরাজ’ থেকে ‘আগন্তুক’! সত্যজিতের জীবনের শেষ ছবিতে নিজের ছায়া হিসেবে কেন শুধু উৎপলকেই দেখতে পেয়েছিলেন পরিচালক?

১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট। চৌষট্টি বছর বয়সে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের এক অন্যতম দিকপাল কিংবদন্তি—উৎপল দত্ত। আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে বাংলা চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণালী ইতিহাস ও তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান নতুন করে আলোড়ন তুলেছে সিনেপ্রেমী মহলে। বিশেষ করে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং বহুমুখী প্রতিভাধর অভিনেতা উৎপল দত্তের জুটি চিরকাল এক অনন্য নজির হয়ে রয়েছে। ‘জন অরণ্য’, ‘হীরক রাজার দেশে’ থেকে শুরু করে সত্যজিতের জীবনের শেষ মাস্টারপিস ‘আগন্তুক’—প্রতিটি কাজেই নিজেদের অভিনয় দক্ষতার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এই কিংবদন্তি।
কেন সৌমিত্রকে বাদ দিয়ে উৎপল দত্ত?
সত্যজিতের জীবনের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এর মূল চরিত্র ‘মনমোহন মিত্র’-র অভিনয়ের জন্য যখন পরিচালক উৎপল দত্তকে বেছে নেন, তখন তার নেপথ্যে ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। চিত্রনাট্য রচনার সময় থেকেই সত্যজিতের ভাবনায় একমাত্র উৎপল দত্তের নামই ভেসে উঠেছিল। কারণ, ‘মনমোহন মিত্র’ চরিত্রটি ছিল খোদ সত্যজিতের ‘অল্টার ইগো’ বা তাঁর নিজের প্রতিচ্ছবি এবং তাঁর নিজস্ব দার্শনিক চিন্তাভাবনার মুখপত্র। সত্যজিৎ রায় নিজেই স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর জীবনের সমস্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি তিনি এই চরিত্রের মধ্যে ঢেলে দিয়েছেন। যার সরল অর্থ, পর্দায় উৎপল দত্ত যা বলতেন, তা আসলে পরিচালকের নিজেরই সুপ্ত ভাবনা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, সত্যজিৎ রায় তাঁর আজীবনের ‘মানসপুত্র’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে কেন এই চরিত্রের জন্য বেছে নিলেন না? সিনেমা বোদ্ধাদের মতে, ‘মনমোহন মিত্র’-র মধ্যে যে একটা ঝোড়ো বোহেমিয়ান ব্যাপার অথচ গম্ভীর ব্যক্তিত্বের ছাপ ছিল, তা একমাত্র উৎপল দত্তের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন সত্যজিৎ। এছাড়া সৌমিত্রকে যেহেতু সত্যজিৎ অতীতে বহু ছবিতে বিভিন্ন প্রধান চরিত্রে ব্যবহার করেছিলেন, তাই নিজের পর্দার প্রতিচ্ছবি হিসেবে অন্য কাউকে সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন তিনি।
যে কারণে উৎপল দত্তের ওপর চোখ বন্ধ ভরসা ছিল রায়ের
আধুনিক সভ্যতার প্রতি মনমোহন মিত্রের সংশয়বাদ, সত্যের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল—সবকিছুর সঙ্গেই উৎপল দত্তের ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্বের এক অদ্ভুত মিল ছিল। তাছাড়া ভাষার ওপর উৎপল দত্তের অসাধারণ পাণ্ডিত্য সত্যজিতের ভারী ও তীক্ষ্ণ সংলাপগুলো নিখুঁতভাবে ডেলিভার করার জন্য তাঁকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। মানবতার ওপর নিজের শেষ শৈল্পিক বক্তব্য তুলে ধরার জন্য সেই সময়ে উৎপল দত্তের চেয়ে উপযুক্ত আর কেউ ছিলেন না। আজ ৩৩ বছর পরেও এই পরিচালক ও অভিনেতার নিখুঁত বোঝাপড়া ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দলিল হয়ে রয়েছে।