নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ! জাতীয় ডিএনএ ডেটাবেস তৈরিতে কেন্দ্রকে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নোটিশ

ভারতজুড়ে নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া শিশুদের বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্তকরণ, নিখুঁত সন্ধান এবং তাদের ভেঙে যাওয়া পরিবারের সঙ্গে দ্রুত পুনর্মিলন সুনিশ্চিত করতে একটি সর্বভারতীয় ডিএনএ ও বায়োমেট্রিক ডেটাবেস তৈরির দাবি জোরালো হয়েছে। এই দাবিতে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলা বা পিআইএল (PIL)-এর শুনানি গ্রহণ করে বুধবার কেন্দ্র ও জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের (NCPCR) কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব তলব করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই আইনি পদক্ষেপে শিশু সুরক্ষা ও মানব পাচার বিরোধী ব্যবস্থায় এক বড় মোড়ল তৈরি হতে পারে বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চের কড়া নির্দেশ
আইনজীবী রীপক কানসালের দায়ের করা এই গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ মামলার শুনানির দায়িত্বে ছিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ বেঞ্চ। আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী প্রবীর চৌধুরীর পেশ করা যুক্তির প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড রাইটস (NCPCR)-কে নোটিশ জারি করেছে। আদালত জানতে চেয়েছে, নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে দেশজুড়ে একটি অভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পরিকল্পনা ঠিক কী রয়েছে।
আবেদনে কী কী দাবি করা হয়েছে?
আবেদনকারীর পক্ষ থেকে দাখিল করা পিআইএলটিতে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান দাবিগুলি হলো:
-
কেন্দ্রীয় ডিএনএ ও বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা: ভারত সরকার এবং দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে নির্দেশ দিতে হবে যাতে নিখোঁজ এবং উদ্ধার হওয়া শিশুদের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক মিলের মাধ্যমে শনাক্তকরণের জন্য একটি সেন্ট্রাল ডেটাবেস বা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
-
রিয়েল-টাইম তথ্য একীকরণ: পুলিশি রেকর্ড, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র বা শেল্টার হোম, শিশু কল্যাণ কমিটি (CWC) এবং মানব পাচার বিরোধী ইউনিট (AHTU)-এর কাছে থাকা শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত সমস্ত বিক্ষিপ্ত তথ্যকে একটি একক ও কেন্দ্রীভূত রিয়েল-টাইম জাতীয় কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা।
-
বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন: নিখোঁজ ও পাচার হওয়া শিশুদের সময়মতো উদ্ধার, বৈজ্ঞানিক তদন্ত এবং সঠিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করার স্বার্থে রাজ্যগুলির মধ্যে বাধ্যতামূলক সমন্বয় সাধনের জন্য জাতীয় ও রাজ্য স্তরে পৃথক শিশু সুরক্ষা ও মানব পাচার বিরোধী টাস্ক ফোর্স গঠন করা।
-
নিয়মিত রিপোর্ট পেশ ও দত্তক নীতি: সুপ্রিম কোর্টে নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা, সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার পরিসংখ্যান এবং মিলকরণ ব্যবস্থার আপডেট দিয়ে পর্যায়ক্রমিক কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দেওয়া। পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন চাইল্ড কেয়ার ইনস্টিটিউশন বা জাতীয় রেকর্ডের ভিত্তিতে যেসব শিশুকে আইনি প্রক্রিয়ায় দত্তক নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তাদের ক্ষেত্রেও ডিএনএ যাচাই বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।
শিশু সুরক্ষায় আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই জনস্বার্থ মামলার রায় যদি আবেদনকারীর অনুকূলে যায়, তবে তা ভারতের শিশু সুরক্ষা ও পাচার রোধের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হারিয়ে যাওয়া হাজার হাজার শিশুকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলেই আশা করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্র কী জবাব দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।