মোজতবা খামেনেই কি চরম সঙ্কটে? ইরানে ক্ষমতার রদবদল নিয়ে চাঞ্চল্যকর জল্পনার মাঝেই বড় প্রশ্ন!

নানা গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই ইরান দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে যে তাদের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই “অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায়” রয়েছেন। তবে এই দাবির মাঝেই আন্তর্জাতিক মহলে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে—যদি সত্যিই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জীবনাবসান ঘটে, তবে চলমান আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও পরিণতির ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?
মোজতবা খামেনেইয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে কেন হঠাৎ এত জল্পনা?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট ও খবরের দাবি অনুযায়ী, তেহরানের একটি অত্যন্ত নিরাপত্তাবেষ্টিত হাসপাতালে মোজতবা খামেনেই বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে। হঠাৎ করে এই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হলো, বাবার মৃত্যুর পর দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার দায়িত্বে আসার পর থেকে মোজতবা এখনও পর্যন্ত একবারও সরাসরি সম্প্রচারে জনসমক্ষে আসেননি কিংবা কোনো প্রকাশ্যে ভাষণ দেননি।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার সময় ইরানের তৎকালীন সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন। গুঞ্জন রয়েছে, সেই একই হামলায় মোজতবা পেটে, পায়ে এবং মুখে গুরুতর আঘাত পান। এর ফলেই তিনি নাকি দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে আসা এড়িয়ে চলছেন এবং শুধুমাত্র লিখিত ডিক্রি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই দেশ শাসন চালাচ্ছেন।
গত কিছুদিন আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পরেই IranWire এবং ইজরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম Channel 14-এর মতো সংবাদমাধ্যমগুলি দাবি করে যে, ইরানি প্রশাসনের ভেতরের সূত্র জানিয়েছে—উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেকোনো সময় তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। এমনকি তাঁকে গুরুতর নিরাপত্তার মধ্যে হাসপাতালে ইনটিউবেট করে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছে বলেও জল্পনা চড়েছে।
ইরানের পাল্টা কৌশল ও ভিডিও প্রকাশ
চলমান যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশের ভেতর আতঙ্ক রোধ করতে এবং স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে দ্রুত আসরে নামে ইরানের রাষ্ট্রসমর্থিত সংবাদমাধ্যম। গত ৮ আগস্ট আধা-সরকারি Mehr News Agency একটি বিরল ১২ থেকে ১৩ সেকেন্ডের ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে মোজতবাকে কালো পাগড়ি পরা অবস্থায় শান্তভাবে একদল উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করতে দেখা যায়।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিরোধী মহলের দাবি, ওই ভিডিওটিতে কোনো তারিখ, সময় বা যাচাইযোগ্য স্থানের উল্লেখ না থাকায় এটি স্পষ্টতই কয়েক মাস পুরনো একটি পুনর্ব্যবহৃত ভিডিও। তেহরান প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে পুরনো ভিডিও ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেই তাদের অভিযোগ। ইরানি কর্মকর্তারা যতই দাবি করুন না কেন যে সর্বোচ্চ নেতা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন, সরাসরি ক্যামেরার সামনে তাঁর অনুপস্থিতি এই জল্পনা জিইয়ে রেখেছে।
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ: মোজতবা খামেনেই মারা গেলে কী হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনেইয়ের মৃত্যু বর্তমান আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। এর ফলে মূলত তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে:
১. অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতার শূন্যতা: স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই মোজতবা ক্ষমতায় এসেছিলেন। ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীর সম্পর্কের সুবাদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘সিংহাসনের আড়ালের ক্ষমতাধর ব্যক্তি’ হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর আকস্মিক প্রস্থান দেশের অভ্যন্তরে বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে। স্পষ্ট উত্তরসূরির অনুপস্থিতিতে আলোচনার পক্ষে থাকা বাস্তববাদী গোষ্ঠী এবং অনড় কট্টরপন্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষমতার লড়াই শুরু হতে পারে। নেতৃত্ব বিভক্ত হলে ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অচল হয়ে যেতে পারে, যার পূর্ণ সুযোগ নিতে পারে আমেরিকা।
২. IRGC-র নিয়ন্ত্রণ ও কট্টরপন্থী আগ্রাসন: যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মোজতবার নিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মোজতবা মারা গেলে অস্তিত্বের সঙ্কটের অজুহাতে IRGC রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে। এর ফলে যুদ্ধ থামার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না, বরং প্রক্সি হামলা বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি এবং আরও বড়সড় প্রতিশোধ নেওয়ার মতো কট্টর সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা। ফলস্বরূপ, আমেরিকা আরও বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হতে পারে।
৩. শান্তি আলোচনা ও আমেরিকার কূটনৈতিক সুবিধা: অন্যদিকে, খামেনেই রাজবংশের সম্পূর্ণ অবসান ঘটলে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর আদর্শগত ভিত্তি ও একনায়কতন্ত্র ভেঙে পড়তে পারে। পেজেশকিয়ান প্রশাসনের মধ্যপন্থী ব্যক্তিরা যদি এই সঙ্কটকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করতে পারেন, তবে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শক্তি তেহরানের থাকবে না। শীর্ষ নেতৃত্বের পতন বা চরম অস্থিরতা তেহরানকে বাধ্য করতে পারে আলোচনার টেবিলে বসতে। এর ফলে যুদ্ধবিরতির শর্ত নির্ধারণ এবং কঠোর পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমেরিকা ও তার মিত্ররা এক বিরাট কূটনৈতিক সুবিধা পেয়ে যেতে পারে।