বর্ষায় পেটের রোগকে মামুলি ভাবছেন? কোন লক্ষণগুলি দেখলে সাবধান হবেন? বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন জানুন

বর্ষা মানেই গরম থেকে স্বস্তি, কিন্তু এর সঙ্গেই আসে এক অদৃশ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি— দূষিত জল। প্রবল বৃষ্টির কারণে নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়া বা জল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে নিকাশির নোংরা জল সহজেই পানের উৎসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। জল দেখতে একেবারে পরিষ্কার হলেও তাতে এমন বহু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যারাসাইট থাকতে পারে যা মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে।

নতুন দিল্লির পিএসআরআই হাসপাতালের এমার্জেন্সি মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডাঃ প্রশান্ত সিনহা-র মতে, বর্ষাকালে হাসপাতালগুলিতে ডায়রিয়া, বমি এবং অন্যান্য গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল বা পেটের রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

বর্ষায় কোন কোন রোগের ঝুঁকি বাড়ে?
ডায়রিয়া ও বমি

টাইফয়েড

হেপাটাইটিস এ এবং ই (জন্ডিস)

কলেরা বা ওলাউঠা

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপদ শুধু খাওয়ার জল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। ফলমূল ধোয়া, রান্না করা, বরফ তৈরি এবং খাবার তৈরির কাজেও দূষিত জল ব্যবহারের মাধ্যমে রোগ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, অনিরাপদ জল এবং অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থার কারণে কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয় এবং টাইফয়েডের মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

জল কীভাবে দূষিত হয় এবং রোগের লক্ষণ কী?
ভারী বৃষ্টির কারণে নিকাশির জল উপচে পড়া এবং দূষিত এলাকার জল পানের উৎসে মিশে যাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। জলের রঙ, গন্ধ বা স্বাদ ঠিক থাকলেই যে তা নিরাপদ, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক দেখতে জলের মধ্যেও ক্ষতিকর জীবাণু লুকিয়ে থাকতে পারে।

সাধারণ পেটের সংক্রমণের ক্ষেত্রে যে লক্ষণগুলি দেখা যায়:

পাতলা বা জলের মতো পায়খানা

পেটে ক্র্যাম্প বা তীব্র যন্ত্রণা

বমি ভাব ও বমি হওয়া

জ্বর

চরম দুর্বলতা ও ক্লান্তি ভাব

খিদে কমে যাওয়া

হেপাটাইটিস এ বা ই-র ক্ষেত্রে জন্ডিস, প্রস্রাবের রঙ হলুদ বা গাঢ় হওয়া এবং চরম অরুচির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
ডায়রিয়ার কারণে শরীরে জলের ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন সবচেয়ে বড় বিপদ। তাই নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিলে সামান্যও দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:

অতিরিক্ত তেষ্টা পাওয়া

খুব কম পরিমাণে প্রস্রাব হওয়া

মুখ শুকিয়ে যাওয়া

মাথা ঘোরানো বা অতিরিক্ত দুর্বলতা

অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা নিস্তেজ হয়ে পড়া

বারবার বমি হওয়া

মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া

উচ্চ বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর

জল বা তরল খাবার খেয়েও পেটে না রাখা

জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেওয়া

ছোট শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম রয়েছে এমন ব্যক্তিরা ডিহাইড্রেশন ও সংক্রমণের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকেন।

নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে?
বর্ষার দিনে সুস্থ থাকতে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি:

নিরাপদ জল পান করুন: খাওয়ার জল সবসময় ফুটিয়ে নিন অথবা বোতলবন্দী নিরাপদ জল ব্যবহার করুন। দাঁত মাজা, খাবার তৈরি এবং বরফ জমানোর ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা অবলম্বন করুন।

কাঁচা খাবারে সাবধান: সালাদ, কাটা ফল, চাটনি বা বাইরের খোলা খাবার যা অনিরাপদ জলে ধোয়া হতে পারে, তা এড়িয়ে চলুন।

গরম ও তাজা খাবার খান: ভালো করে সেদ্ধ বা রান্না করা খাবার খাওয়া নিরাপদ।

হাত পরিষ্কার রাখুন: শৌচাগার ব্যবহারের পরে এবং খাবার খাওয়া বা রান্নার আগে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।

জল সুরক্ষিত রাখুন: ঢাকা পাত্রে জল সংরক্ষণ করুন এবং বারবার নোংরা হাত বা থালাবাসন তাতে ডুবিয়ে জল তুলবেন না।

ডাঃ প্রশান্ত সিনহার মতে, “বর্ষার পেটের রোগকে রুটিন ফুড পয়জনিং ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রতিরোধ শুরু হয় নিরাপদ পানীয় জল দিয়েই।” তাই এই বর্ষায় একটু সচেতনতাই আপনাকে ও আপনার পরিবারকে রাখতে পারে সুস্থ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *