কুকুরের দিন শেষ, এবার কি বিড়ালের যুগ? শহুরে ভারতীয়দের প্রথম পছন্দ কেন বদলে যাচ্ছে জানেন?

কোনো ভারতীয় পরিবার যদি বাড়িতে বিড়াল পোষার কথা ঘোষণা করত, তবে একটা সময়ে তার প্রতিক্রিয়া হত বেশ অনুমেয়— “আরে, বিড়াল তো বড্ড অহংকারী!” অন্যদিকে কুকুর ছিল স্বাভাবিক পছন্দ— অনুগত, আবেগপ্রবণ, দরজায় দেখা মাত্র অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত এবং আপনার সাথে যেকোনো জায়গায় যেতে ইচ্ছুক।

কিন্তু ভারতের ক্রমবর্ধমান উল্লম্ব (উঁচু বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কালচার), শহুরে এবং সময়-সংকটময় শহরগুলিতে সেই সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। বিড়ালগুলো আর পোষ্য সংক্রান্ত আলোচনার কোণায় পড়ে নেই, বরং চলে এসেছে একেবারে কেন্দ্রে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিড, পোষ্যের কেয়ার আইল, এমনকি বিশেষ উদ্ধারকারী কেন্দ্রগুলিতেও এখন বিড়ালের জয়জয়কার। এই বদলটা পুরোপুরি ‘কুকুর থেকে বিড়াল’ বিপ্লব না হলেও, আধুনিক ভারতীয় জীবন সম্পর্কে এটি এক চমৎকার তথ্য প্রকাশ করে— যে গুণগুলোর জন্য একসময় বিড়ালকে কম স্নেহপ্রবণ বলা হতো, আজ তা স্বাধীনচেতা মনভাব, ব্যক্তিগত সীমানা এবং নিজের শর্তে সাহচর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কেন হঠাৎ বিড়ালের প্রেমে পড়ছেন ভারতীয়রা?
ভারতের বড় বড় শহরগুলোতে বিড়াল এখন আর শুধু এমন কোনো প্রাণী নয় যাকে বাড়ির ফেরার পথে কেউ খাইয়ে দেয়, বরং মানুষ তাদের সকালেই বাড়ি নিয়ে আসছে। তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট, জন্মদিনের কেক, ডিজাইনার টেম্পো, বিশেষ খাবার, ভেটেরিনারি অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং পরিবার বা বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও এখন তাদের অবাধ যাতায়াত। ক্যাট ক্যাফেগুলো শহুরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে, উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি বিড়াল দত্তক নেওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধির খবর দিচ্ছে এবং ক্যাট শো-গুলোতে শত শত মানুষের ভিড় জমছে।

এই পরিবর্তনটি এতটাই দৃশ্যমান যে নাগরিক কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে আহমেদাবাদ পোষ্য বিড়ালের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করে। এর মাত্র ১২ দিনের মধ্যে ৭৫ জন বাসিন্দার ৯১টি বিড়াল রেজিস্টার্ড হয়, যার মধ্যে ৩১টি ছিল দেশি জাতের বিড়াল।

আর আজ, আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবসে (৮ আগস্ট, ২০২৬), এই পোরিং, পোস্ট আর আদরের আড়ালে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসছে: ভারতীয় পরিবারগুলি হঠাৎ কেন বিড়ালের জন্য ঘরের দরজা খুলে দিচ্ছে?

আধুনিক ভারতীয় শহর: বিড়ালের আদর্শ বাসস্থান
বেঙ্গালুরু, মুম্বই, দিল্লি বা হায়দরাবাদের একজন তরুণ পেশাদারের জীবনধারা বিবেচনা করুন: একটি কমপ্যাক্ট অ্যাপার্টমেন্ট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজটপূর্ণ যাতায়াত এবং সম্ভবত খোলা জায়গায় যাওয়ার সুযোগ খুবই কম।

কুকুরদের মতো বিড়ালদের প্রতিদিন বাইরে হাঁটাতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না এবং তাদের উল্লম্ব স্থান (Vertical space) ব্যবহার করার ক্ষমতা তাদের যথাযথভাবে সমৃদ্ধ অ্যাপার্টমেন্টে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। তাদের গ্রুমিংয়ের অভ্যাস এবং তুলনামূলকভাবে স্বাধীন রুটিন এমন সব মানুষদের আকর্ষণ করে যাদের কাজের সময় অনির্দেশ্য।

অবশ্য ভেটেরিনারি চিকিৎসকরা ‘কম রক্ষণাবেক্ষণ’ কথাটির পাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ তারার চিহ্ন (Asterisk) বসিয়ে থাকেন। বিড়ালদের হয়তো কুকুরের মতো প্রতিদিন বাইরে ব্যায়াম করানোর প্রয়োজন হয় না, তবে অন্দরে থাকা বিড়ালদেরও খেলাধুলা, ব্যায়াম, পরিবেশগত উদ্দীপনা, আঁচড়ানোর সুযোগ, লিটার সুবিধা এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন।

আর ঠিক এই কারণেই হয়তো তরুণ ভারতীয়দের কাছে বিড়াল এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে: তারা সহচর প্রাণীর মানসিক আনন্দটুকু বজায় রেখেই ছোট শারীরিক ও সময়ের পরিসরে দিব্যি মানিয়ে নিতে পারে।

‘অহংকারী বিড়াল’ তকমাটি কি ভুল?
বিড়ালের সবচেয়ে বড় পাবলিক রিলেশন সমস্যাই হয়তো আজ তাদের সবচেয়ে বড় সেলিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিড়ালকে একাকী, রহস্যময় এবং উদাসীন হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এর বিপরীতে কুকুরকে খোলাখুলি স্নেহশীল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বিড়ালের আচরণ অনেক বেশি সূক্ষ্ম।

‘কারেন্ট বায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত ২০১৯ সালের একটি যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল মানুষের সাথে বাচ্চাদের ও কুকুরের মতো সংযুক্তির বন্ধন তৈরি করতে পারে। অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায় প্রায় ৬৪ শতাংশ ছানা এবং ৬৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বিড়াল নিরাপদ সংযুক্তির পরিচয় দিয়েছে। গবেষকরা উপসংহারে পৌঁছেছেন যে বিড়াল তাদের মানব যত্নশীলদের আরাম ও নিরাপত্তার উৎস হিসেবে দেখতে পারে।

সুতরাং, যে বিড়ালটি আপনার বাহুডোরে ঝাঁপিয়ে না পড়ে আপনার থেকে তিন ফুট দূরে বসে থাকে, সে হয়তো আসলে এটি বোঝাতে চায় না যে “আমি আপনাকে পছন্দ করি না।” সে বরং এ কথাই বোঝাতে চায় যে, “আপনার চারপাশে নিজের মতো করে সময় কাটানোর মতো স্বস্তি আমি পাচ্ছি।” এমন একটি সংস্কৃতিতে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে ব্যক্তিগত জায়গা, স্বাধীনতা এবং মানসিক সীমানা দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে।

এই স্বাধীনতাই এখন কাঙ্ক্ষিত
এখানে একটি চমৎকার সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে।
আধুনিক শহুরে জীবন নোটিফিকেশন, মিটিং, ট্রাফিক, সামাজিক বাধ্যবাধকতা এবং ডিজিটাল কোলাহলে পরিপূর্ণ। কুকুরের উচ্ছ্বসিত উদ্দীপনা দারুণ হতে পারে, কিন্তু বিড়াল একটি ভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আসে: অবিরাম মনোযোগের দাবি না জানিয়ে সাহচর্য দেওয়া।

একটি বিড়াল আপনার চারপাশে কোনো হইচই ছাড়াই একই ঘরে থাকতে পারে। আপনি কাজ করার সময় সে আপনার পাশে ঘুমাতে পারে। সে হয়তো আপনার স্নেহের জন্য সামনে আসবে এবং পাঁচ মিনিট পর আবার মিলিয়ে যাবে। দরজায় আপনাকে অভ্যর্থনা জানাতে পারে—অথবা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে অভ্যর্থনা একটু পরেই দেওয়া যাবে।

যে প্রজন্ম সীমানার ধারণার সাথে স্বচ্ছন্দ, তাদের কাছে এটিকে উদাসীনতার চেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। এই বৈপরীত্যটি বেশ আকর্ষণীয়: যে বৈশিষ্ট্যটি একসময় বিড়ালকে কুকুরের চেয়ে পিছিয়ে রেখেছিল, আজ সেটাই তাদের ফ্যাশনেবল করে তুলেছে।

ভারতের দেশি বিড়ালরাও এই গল্পের অংশ
ভারতের বিড়ালের গল্পটি কেবল পার্সিয়ান, মেইন কুন বা অন্যান্য দামি জাতের বিড়ালকে নিয়ে নয়।

দত্তক নেওয়া এবং প্রাণীকল্যাণের ওপর ক্রমবর্ধমান জোর পোষ্য সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বদলে দিচ্ছে। পোষ্যকে কেবল আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে না দেখে, শহুরে ভারতীয়রা এখন উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং সহাবস্থানকে দায়িত্বশীল পোষ্য অভিভাবকত্বের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করছেন।

যেমন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বেঙ্গালুরুর ইয়েলাচেনাহল্লিতে রাস্তার বেওয়ারিশ, আহত, উদ্ধার হওয়া এবং পরিত্যক্ত বিড়ালদের যত্ন নিতে ও দত্তক নেওয়ার সুবিধার্থে একটি বিশেষ ক্যাট রেসকিউ এবং রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার খোলা হয়।

পাশাপাশি, চেন্নাই কর্পোরেশন ২০২৬ সালের জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনের আগের ছয় মাসে ৪,২৭১টি পোষ্য বিড়াল নিবন্ধনের কথা জানিয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার স্থানীয় এবং পার্সিয়ান বিড়াল।

কুকুর বলে: আমি তোমাকে ভালোবাসি! আমরা এরপর কী করছি?
বিড়াল বলে: আমিও তোমাকে ভালোবাসি। এবার আমাকে একটু জায়গা দাও।

আজকের শহুরে ভারতীয়ের কাছে, এটিকে আর উদাসীন বলে মনে হয় না। এটিকে নিখুঁত সম্পর্কের সংজ্ঞা বলেই মনে হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *