প্রথম দিনেই ১৪৫ কিমি বেগে ছুটল দেশের প্রথম বন্দে ভারত ফ্রেইট ট্রেন! ট্রায়াল শুরু কোটায়

ভারতের লজিস্টিক ও পার্সেল পরিবহন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক করে তুলতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করল ভারতীয় রেল। দেশের প্রথম বন্দে ভারত ফ্রেইট ট্রেন (Vande Bharat Freight Train)-এর আনুষ্ঠানিক ট্রায়াল রান শুরু হয়ে গেল। পরীক্ষামূলক চালনার প্রথম দিনেই ট্রেনটি তাক লাগিয়ে দিয়ে সর্বোচ্চ ১৪৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিবেগ অর্জন করেছে। বর্তমানে পশ্চিম মধ্য রেল (WCR) জোনের কোটা ডিভিশনে এক মাসব্যাপী এই ট্রায়াল ফেজ চলছে।

কোথায় এবং কীভাবে চলছে পরীক্ষা?
চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (ICF)-তে তৈরি ১৬ কোচের এই প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক ফ্রেইট ইএমইউ (Freight EMU) প্রোটোটাইপ রেকটি কোটায় এসে পৌঁছায়। কোটা ডিভিশনের সিনিয়র ডিভিসনাল কমার্শিয়াল ম্যানেজার সৌরভ জৈন জানিয়েছেন, গবেষণা ও নকশা সংস্থা RDSO (Research Designs and Standards Organisation)-এর তত্ত্বাবধানে এই পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

পরীক্ষার জন্য কোটা-নাগদা-সয়াই মাধোপুর (Kota-Nagda-Sawai Madhopur) সেকশনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা ভারতীয় রেলের অন্যতম সেরা হাই-স্পিড টেস্ট করিডোর হিসেবে পরিচিত। গত ২৯ জুলাই সকাল ৬টায় কোটা থেকে মহিদপুর রোডের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই ট্রায়াল সিরিজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রথম দিনে ট্রেনের গতিবেগ প্রথমে ১২০ ও ১৩৫ কিমি রাখা হলেও, কোটায় ফেরার পথে ট্রেনটি অনায়াসেই ১৪৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা সর্বোচ্চ গতি ছুঁয়ে ফেলে। নিরবচ্ছিন্ন সবুজ সিগন্যালের জেরে পুরো যাত্রাপথটি অত্যন্ত মসৃণ ছিল বলে জানিয়েছে রেল।

আগামী এক মাস ধরে এই রুটে প্রতিদিন অন্তত দুটি রাউন্ড ট্রিপ করানো হবে। এই বিস্তৃত পরীক্ষার তালিকায় রয়েছে:

১২০, ১৩০, ১৪০ ও ১৪৫ কিমি বেগে লোড কন্ডিশনে অসillation বা দোলন পরীক্ষা।

জরুরি ব্রেকিং দূরত্ব (EBD) এবং কাপলার ফোর্স টেস্ট।

বিভিন্ন বাঁকে পারফরম্যান্স, ট্র্যাকশন, ব্রেকিং এবং জার্ক ইভ্যালুয়েশন।

সিগন্যাল ইন্টারফারেন্স, স্বয়ংক্রিয় দরজা ও ইলেকট্রিক্যাল শর্ট-সারকিট সেফটি টেস্ট।

কোটা ডিভিশনকেই কেন বেছে নেওয়া হলো?
ভারতীয় রেলের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রধান প্রভিং গ্রাউন্ড হিসেবে ইতিমধ্যেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে কোটা ডিভিশন। এই অঞ্চলের উন্নত ট্র্যাক পরিকাঠামো, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং সার্বিক অপারেশনাল নিরাপত্তার জন্যই রেল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এক্সপ্রেস ফ্রেইটের আধুনিক সব বৈশিষ্ট্য
সময়-সংবেদনশীল কার্গো বা পার্সেল দ্রুত পরিবহনের জন্য তৈরি এই ১৬ কোচের রেকের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

বিশেষ কোচ বিন্যাস: পচনশীল দ্রব্যের জন্য ২টি রেফ্রিজারেটেড ডিটিসি (DTC) ভ্যান, ২টি এনডিটিসি (NDTC) কোচ এবং ১২টি সাধারণ পার্সেল কোচ রয়েছে।

ভারবহন ক্ষমতা: এর এক্সেল লোড ক্যাপাসিটি ২০.৩২ টন এবং এটি একসাথে মোট ৩৯৭.০২ টন পেলোড বহন করতে সক্ষম।

অটোমেটিক প্রযুক্তি: মালপত্র দ্রুত তোলা ও নামানোর জন্য কোচে রয়েছে নিউম্যাটিক রিট্র্যাক্টেবল রোলার ফ্লোরিং এবং প্রতিটি কোচে চারটি করে চওড়া স্বয়ংক্রিয় স্লাইডিং ডোর। ট্রেন ৫ কিমি প্রতি ঘণ্টার বেশি গতি ধরলেই দরজা নিজে থেকে লক হয়ে যায় এবং সমস্ত দরজা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত না হলে ট্রেন এগোবে না।

নিরাপত্তা ও অন্যান্য: বিল্ট-ইন ফায়ার ডিটেকশন, কন্টেইনার লক, সিসিটিভি এবং আধুনিক বন্দে ভারত ব্রেকিং সিস্টেম।

রেল আধিকারিকদের মতে, এই ফ্রেইট ইএমইউ-এর বাণিজ্যিক সাফল্য দেশের হাই-স্পিড পার্সেল করিডোর, ই-কমার্স লজিস্টিকস এবং কোল্ড চেইন পরিবহনের ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব আনবে। ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থার চেয়ে অনেক দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য পরিবহনে এটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *