ভারতের ঠিক সীমান্তেই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা! ৫টি জেলায় কার্ফু জারি, পুলিশের গুলিতে নিহত ২!

নেপালের মধেশ প্রদেশের অন্তত পাঁচটি জেলা বর্তমানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সম্পূর্ণ উত্তাল। ভারত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে একাধিক জেলায় কড়া কার্ফু জারি করা হয়েছে, যার ফলে বাধ্য হয়ে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে এবং সমস্ত ট্রেন ও বাস পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছে।
নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘ই-কান্তিপুর’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুনসারি, সারলাহি, জনকপুর এবং ধনুশা জেলা এই সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক ব্যর্থতার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুংকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি সর্বদলীয় বৈঠকও ডেকেছেন।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সহিংস সংঘর্ষ?
স্থানীয় ‘নেপাল নিউজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, সুনসারি জেলার কাপ্তানগঞ্জ এলাকায় এই রক্তক্ষয়ী সহিংসতার সূত্রপাত হয়। পবিত্র কাওয়ার যাত্রার আগে কাপ্তানগঞ্জের কিছু উগ্র যুবক একটি এলাকার খুঁটি থেকে মুসলিম পতাকা নামিয়ে তার পরিবর্তে সেখানে গেরুয়া পতাকা টাঙিয়ে দেয়। এরপর তারা একটি স্থানীয় মন্দিরের বাইরে অত্যন্ত উচ্চস্বরে ডিজে বাজাতে শুরু করে।
পুলিশ সূত্রের খবর, এলাকার কয়েকজন মুসলিম যুবক এই ঘটনার তীব্র আপত্তি জানালে তা প্রথমে কথা কাটাকাটি ও পরবর্তীতে সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি দ্রুত হাতের বাইরে চলে গেলে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। আর তাতেই দুই হিন্দু যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পুলিশের গুলিতে গণেশ যাদব নামে আরও এক যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে নিহত যুবকদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
৮ বছরে ১৭ বার দাঙ্গা, আসল কারণ কী?
বিশ্লেষকদের তথ্য বলছে, গত আট বছরে নেপালে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মোট ১৭টি ছোট-বড় দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই বীরগঞ্জ এলাকায় এরকমই এক সংঘর্ষের জেরে টানা এক সপ্তাহ কার্ফু জারি রাখতে হয়েছিল। এর আগে ২০১৭ সালেও কপিলবস্তুতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে প্রায় ১০০টি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের (UNHCR) একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে মুসলিম-বিরোধী হিংসার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়ে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা। উল্লেখ্য, নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮২ শতাংশ হিন্দু এবং প্রায় ৯ শতাংশ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ের।
গেটিসবার্গ কলেজের অধ্যাপক মেগান অ্যাডামসন সিজাপতির মতে, ২০০৮ সাল পর্যন্ত নেপাল একটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ছিল। পরবর্তীতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ সালের আগের পরিস্থিতির তুলনায় নেপালের মুসলমানরা এরপর ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হন, যা দুই সম্প্রদায়ের সামাজিক ভারসাম্যে টানাপোড়েন তৈরি করে। আর সেই পারিপার্শ্বিক উত্তেজনাই পরবর্তীতে বারবার ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে।