লার্নিং ও সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় বড় ধাক্কা! জেন-জির আত্মমর্যাদা কি শুধুই লাইক-ভিউয়ের ওপর নির্ভরশীল?

আজকের তরুণ-তরুণী ও জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্য কি পুরোপুরি বন্দি হয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, ভিউ আর কমেন্টের খোপে? সাম্প্রতিক এক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় উঠে এল এমনই এক উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে প্রত্যাশিত এনগেজমেন্ট বা লাইক না পেলে আজকের প্রজন্মের বহু তরুণী তীব্র উদ্বেগ, প্রত্যাখ্যান বোধ এবং চরম একাকীত্বে ভুগে থাকেন।

কোটার গভর্নমেন্ট আর্টস গার্লস কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জ্যোতি সিদানার-এর তত্ত্বাবধানে ২৫ দিন ধরে এই বিশেষ গবেষণাটি পরিচালিত হয়। মূলত ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব কেমন পড়ছে, তা খতিয়ে দেখতেই এই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। যেখানে বিভিন্ন কলেজের মোট ১৪১ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

সমীক্ষায় উঠে আসা চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান:
ডিজিটাল দুনিয়ার এই কৃত্রিম ও ভুয়া মোহের জগৎ নিয়ে ছাত্রীদের মতামত ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—

৪৩.৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়া মূলত এক ধরনের ‘লোকদেখানোর সংস্কৃতি’ বা শো-অফকে উৎসাহিত করে।

৪১.৫ শতাংশ ছাত্রীর মতে, এই ডিজিটাল নির্ভরতা তাঁদের আসল বা প্রকৃত পরিচয়কেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

১৪.৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এটি অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক খরচকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ট্রোলিং ও নিখুঁত ভাবমূর্তির ইঁদুর দৌড়:
অনলাইনে সবসময় একটি ‘নিখুঁত ভাবমূর্তি’ (Perfect Image) বজায় রাখার মানসিক চাপ তরুণ-তরুণীদের আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দিচ্ছে। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ তরুণী জানিয়েছেন যে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো নেতিবাচক মন্তব্য বা ট্রোলিংয়ের শিকার হলে তাঁরা তীব্র মানসিক চাপ ও বিরক্তির মুখে পড়েন। তবে বাকি ৩৯ শতাংশ অবশ্য দাবি করেছেন যে এই ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য তাঁদের মনে কোনো প্রভাব ফেলে না।

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা ও বাঁচার উপায়:
জেন-জি প্রজন্ম হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে বেড়ে ওঠা প্রথম ‘ডিজিটাল নেটিভ’ প্রজন্ম। তারা যেমন অসীম প্রযুক্তিগত সুবিধা পাচ্ছে, তেমনই তাদের নিত্যদিন মোকাবিলা করতে হচ্ছে উদ্বেগ, অন্যের সঙ্গে তুলনা, একাকীত্ব এবং মারাত্মক ডিজিটাল আসক্তির মতো চ্যালেঞ্জগুলির। অধ্যাপক ড. জ্যোতি সিদানার সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো এই ডিজিটাল ভারসাম্য বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা না গেলে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য গবেষকদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:

নিয়মিত ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকা।

ভার্চুয়াল জগতের বাইরে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে বেশি করে মুখোমুখি (Face-to-face) কথোপকথন করা।

লাইক, কমেন্ট বা ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মূল্য বিচার করা বন্ধ করা।

অধ্যাপক সিদানার জোর দিয়ে বলেছেন, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো বাস্তব জীবনের প্রকৃত সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আলাপচারিতা। কারণ ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্ট কখনোই মুখোমুখি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক বা আবেগগত সমর্থন জোগাতে পারে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *