কয়েক মাস আগেও অস্তিত্ব ছিল না! ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা CJP-র তরুণ তুর্কি মুখ সৌরভ দাস আসলে কে?

মাত্র কয়েক মাস আগেও যে রাজনৈতিক দলের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janata Party বা CJP) আজ ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দিল্লিতে যে বিশাল ছাত্র-যুব আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে এই সিজেপি দলই। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দেশজুড়ে পরিচিত মুখ হলেও, তাঁর পাশাপাশি সমানভাবে নজর কেড়েছেন সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস (Sourabh Das)। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে শুরু করে রাজপথের আন্দোলন—সব জায়গাতেই সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। কিন্তু কে এই সৌরভ দাস?
কীভাবে তৈরি হল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দেশের যুবসমাজ ও আন্দোলনকারীদের একাংশকে রূপক অর্থে ‘আরশোলা’র (Cockroach) সঙ্গে তুলনা করার পরই তীব্র প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। এরপরই সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট সৌরভ দাস এই দলে যোগ দেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন। দিল্লির স্থায়ী বাসিন্দা সৌরভের বয়স কম হলেও তাঁর কাজের পরিধি বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়।
পড়াশোনা ও সাংবাদিকতার ব্যাকগ্রাউন্ড
সিজেপির প্রায় সব সদস্যই অল্পবয়সী এবং অধিকাংশই এখনও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেমন দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক রিলেশনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। অন্যদিকে, সৌরভ দাস জার্নালিজম ও মাস কমিউনিকেশন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কলেজ জীবন থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর তীব্র ঝোঁক তৈরি হয়েছিল। তবে শুধু মূলধারার সাংবাদিকতাই নয়, তিনি একজন অত্যন্ত সক্রিয় আরটিআই (RTI) কর্মী হিসেবেও বিশেষভাবে পরিচিত।
আরটিআই অ্যাক্টিভিসম থেকে সাংবাদিকতা
মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ২০১৭ সাল থেকেই তথ্যের অধিকার আইনে (RTI) একের পর এক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করতে শুরু করেন সৌরভ এবং সেই মামলার তথ্য থেকে সত্য উদ্ঘাটন করে জোরালো প্রতিবেদন লেখেন।
কোভিড কালে বিশেষ ভূমিকা: মহামারী চলাকালীন বিচারাধীন আরটিআই মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তিনি সরাসরি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁর প্রবল আইনি চাপের ফলেই কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনকে (CIC) বহু বিচারাধীন মামলায় দ্রুত পদক্ষেপ করতে হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে: আরটিআই-এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে এনে তিনি আরোগ্য সেতু অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর সরকারের নীতি, জেএনইউ (JNU) হিংসা মামলা সহ একাধিক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
প্রকাশনা ও মিডিয়া: তাঁর করা বিভিন্ন আইনি লড়াই জাতীয় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক জায়গা পেয়েছে। পাশাপাশি, সৌরভ নিজে ‘ক্যারাভান ম্যাগাজিন’, ‘আর্টিকেল ১৪’, ‘আল জাজিরা’, ‘দ্য ওয়ার’, ‘দ্য হিন্দু’ এবং ‘নিউ লাইনস ম্যাগাজিন’-এর মতো প্রথম সারির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত লিখেছেন। স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে তাঁর বেশ খ্যাতি রয়েছে।
বর্তমানে তিনি ‘কমপ্লিসিট সাইলেন্স: দ্য কোর্টস রোল ইন ইন্ডিিয়াস কোয়াইট সাফারিং’ (Complicit Silence: The Court’s Role in India’s Quiet Suffering) নামে একটি বই লিখছেন, যেখানে দেশের বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, তিনি ‘দ্য জাস্টিস ব্রিফ উইথ সৌরভ দাস’ নামে একটি প্রশংসিত শো-ও সঞ্চালনা করেছেন।
রাজনৈতিক পরিচয় ও বিতর্ক
তিহার জেলে বন্দি কিছু অভিযুক্তের সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার পর অতীতেও খবরের শিরোনামে এসেছিলেন সৌরভ। এর মধ্যে দিল্লি দাঙ্গা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত উমর খালিদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ছবি নিয়ে নেটদুনিয়ায় তাঁর রাজনৈতিক পছন্দ ও আদর্শ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। যদিও সৌরভ দাস একাধিকবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি নিজেকে একজন আপাদমস্তক স্বাধীন সাংবাদিক এবং সমাজকর্মী হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। বর্তমান নিট আন্দোলনে তাঁর এই জোরালো ভূমিকা তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত মুখ করে তুলেছে।