প্রকৃতির ভয়ঙ্কর তাণ্ডব! ঘণ্টায় ১৪৫ কিমি বেগে দক্ষিণ চিনে আছড়ে পড়ল শক্তিশালী টাইফুন ‘নৌল’

প্রকৃতির কোপে ফের চরম বিপর্যস্ত দক্ষিণ চিন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আরও এক অত্যন্ত শক্তিশালী টাইফুনের আঘাতে পুরোপুরি লন্ডভন্ড হয়ে গেল গুয়াংডং প্রদেশ এবং হংকং সংলগ্ন বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এলাকা। স্থানীয় সময় রবিবার ভোরে ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর প্রায় ৩টে বেজে ৫০ মিনিট, সেই সময় ঘণ্টায় প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার বেগে গুয়াংডং প্রদেশের হুইঝৌ শহরের হুইডং কাউন্টির উপকূলে স্থলভাগে প্রবেশ করে টাইফুন ‘নৌল’ (Noul)।
ঝোড়ো হাওয়ার দাপট, মুষলধারে বৃষ্টি, উত্তাল সমুদ্র এবং ভূমিধসের আশঙ্কায় গোটা অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে আগেভাগেই তৎপর হয় প্রশাসন। রবিবারের ঝড়ের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে সাড়ে ৩ লক্ষেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় বহু রেল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শতাধিক বিমান বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ব্যাপক প্রস্তুতি ও উদ্ধারকার্য
চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘সিসিটিভি’র তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার পরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শনিবার বিকেলের মধ্যেই শুধুমাত্র গুয়াংডং প্রদেশ থেকে ৩ লক্ষ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। উপকূলবর্তী বিপজ্জনক গ্রাম ও বসতিগুলিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা হয়। সমুদ্রে মাছ ধরার সমস্ত নৌকাগুলিকে আগেই নিরাপদ বন্দরে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এবং জেলেদের সমুদ্রে যাওয়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
পরিবহণ ও বিমান পরিষেবায় চরম ধাক্কা
‘চায়না নিউজ সার্ভিস’ সূত্রে জানা গেছে, টাইফুনের জেরে রবিবারের জন্য গুয়াংডং প্রদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন পরিষেবা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। ঝড়ের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, বিমান চলাচলেও বড়সড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনি ও রবিবার মিলিয়ে ইতিমধ্যেই ১৫০টিরও বেশি উড়ান বাতিল করা হয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান নির্ধারিত সময়ের থেকে বহু ঘণ্টা বিলম্বিত হওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। একাধিক বিমান সংস্থা যাত্রীদের তাদের ভ্রমণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বা ভ্রমণের দিন বদল করার পরামর্শ দিয়েছে।
হংকং ও তাইওয়ানের পরিস্থিতি
হংকং: টাইফুনের ভয়ংকর দাপট পরিষ্কারভাবে অনুভূত হয়েছে হংকং শহরেও। শনিবার বিকেলে ঝড়ের জেরে শহরের একটি বহুতলের বাইরের বিশাল স্ক্যাফোল্ডিং বা নির্মাণকাজের মাচা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হলেও স্থানীয় পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাবে শহরের একাধিক জায়গায় গাছ উপড়ে পড়া এবং ছোটখাটো ক্ষয়ক্ষতির খবর মিলেছে। হংকং মানমন্দির জানিয়েছে, নৌল ক্রমশ অভ্যন্তরের দিকে এগোচ্ছে এবং এর প্রভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
তাইওয়ান: তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, নৌলের প্রভাবে দ্বীপের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বেশ ভালোই বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে ঝড়টি তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত না হেনে দক্ষিণ দিকের সমুদ্রপথ দিয়ে অতিক্রম করে ধীরে ধীরে দ্বীপ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
চলতি মাসে বারবার প্রকৃতির কোপ
আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও টাইফুনের সংখ্যা এবং তীব্রতা দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। উল্লেখ্য, চলতি মাসেই চিনকে একের পর এক শক্তিশালী টাইফুনের ধাক্কা সামলাতে হয়েছে:
গত ১১ জুলাই টাইফুন ‘বাভি’ পূর্ব চিনে আছড়ে পড়ে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, সেসময় ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
তার আগে গত ৩ জুলাই টাইফুন ‘মাইসাক’ দক্ষিণ চিনে প্রবল তাণ্ডব চালায়।
সেই পুরনো ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি, তার মধ্যেই ফের টাইফুন নৌলের আঘাতে নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে উপকূলবর্তী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে। বর্তমানে চিনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, গুয়াংডং এবং দক্ষিণ-পূর্ব ফুজিয়ান প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগামী কয়েক ঘণ্টাও প্রবল বর্ষণ ও দমকা হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং শহরাঞ্চলে জল জমে যাওয়ার আশঙ্কা মাথায় রেখে পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী।