ভারতে নতুন ইতিহাস গড়ল CJP, কী ভাবে সফল দু’মাসের সংগ্রাম?

অন্ধকার আবর্জনাময় এলাকায় বেড়ে ওঠা মেরুদণ্ডহীন এক পতঙ্গ ‘তেলাপোকা’ বা ইংরেজি ভাষায় ‘ককরোচ’। স্প্যানিশ শব্দ ‘cucaracha’ থেকে আসা এই নামটিকে ঘিরেই বর্তমানে তোলপাড় গোটা দেশ। দেশের প্রথম জেনারেশন জ়ার্স বা ‘জেন জি’ (Gen Z)-দের হাত ধরে জন্ম নেওয়া মাত্র দুই মাস বয়সি এক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের জেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
এক নজরে আন্দোলনের কালপঞ্জি:
-
১৫ মে: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র অভিজিৎ দীপকের মস্তিষ্কপ্রসূত ও সমাজমাধ্যম নির্ভর ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র সূচনা।
-
৬ জুন: দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস-বিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনের সূচনা।
-
৭ জুলাই: আদালতের নির্দেশে ককরোচদের এক্স (Twitter) হ্যান্ডল পুনরায় চালু হয়।
-
২০ জুলাই: ‘চলো সাংসদ’ অভিযানে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হন প্রায় ৬০ জন আন্দোলনকারী। দেশজুড়ে ৩৪টি শহরে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন।
-
২৩ জুলাই: মধ্যরাতে অনশন প্রত্যাহার করেন আন্দোলনে যোগ দেওয়া বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।
-
২৫ জুলাই: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনকারীদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা।
‘ককরোচ’ নামের সূত্রপাত ও ব্যাঙ্গাত্মক আন্দোলনের সূচনা
দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই নামকরণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টে এক মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, কিছু তরুণ-তরুণীকে তেলাপোকার (ককরোচ) সঙ্গে তুলনা করা চলে, যাঁদের পেশাগত ক্ষেত্রে বা চাকরিতে কোনও স্থান নেই অথচ সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাঁরা নির্বিচারে আক্রমণ চালান।
এই মন্তব্যের পরেই বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপকে এবং তাঁর সহযোগীরা মিলে শাসক দলের নাম অনুকরণ করে সম্পূর্ণ ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করেন। AI প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করার কাজ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই CJP-র ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা দেশের বহু রাজনৈতিক দলের মূল হ্যান্ডলকেও ছাড়িয়ে যায়।
নিট কেলেঙ্কারি ও আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ রূপ
গত ৬ জুন আমেরিকা থেকে ফিরে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনের ডাক দেন অভিজিৎ। তাঁর সঙ্গে সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা, সোনম ওয়াংচুক সহ একাধিক প্রতিনিধি এই আন্দোলনে যুক্ত হন।
গত ২০ জুলাই ‘চলো সাংসদ’ অভিযান ঘিরে যন্তর মন্তর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের অতিসক্রিয়তা ও লাঠিচার্জের ছবি দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। দিল্লির পাশাপাশি পাটনা, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুনে সহ দেশের ৩৪টি শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন।
শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে ককরোচ জনতা পার্টি তাদের প্রধান তিনটি দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়: ১. কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। ২. আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত এফআইআর ও আইনি মামলা নিঃশর্তে প্রত্যাহার। ৩. নিট কেলেঙ্কারিতে মৃত পরীক্ষার্থীদের পরিবারপিছু এক কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য।
যাঁদের পাশে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী ব্যাকআপ ছিল না, জেন-জি প্রজন্মের সেই তরুণরাই প্রমাণ করে দিলেন যে— সত্যের পথে অবিচল থেকে সংঘবদ্ধ লড়াই চালালে বড় থেকে বড় প্রাচীরও গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।