মি টু-র জেরে এমজে আকবর থেকে নিট কাণ্ডে ধর্মেন্দ্র প্রধান! মোদী সরকারের দীর্ঘ মেয়াদের দ্বিতীয় পদত্যাগের ইতিহাস

মোদী সরকারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হলো। বিরোধীদের লাগাতার আন্দোলন, সংসদ অচল হওয়া কিংবা নানা রাজনৈতিক বিতর্ক উঠলেও গত ১১ বছরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে মন্ত্রীদের পদত্যাগ না করানোর যে অনমনীয় নীতি বা ‘নো রেজিগনেশন’ তত্ত্ব বজায় রেখেছিল সরকার, শনিবার তাতে বড়সড় ছেদ পড়ল। নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে দেশজুড়ে চলা তীব্র ছাত্র আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর মাধ্যমেই তিনি ২০১৪ সালে এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব ছাড়লেন, যা এক দশকে এক বিরল রাজনৈতিক ঘটনা।
মোদী জমানায় পদত্যাগের নজির: এমজে আকবর থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধান
২০১৫ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং মন্ত্রিসভার এক বৈঠকের পর জোর দিয়ে বলেছিলেন, “এনডিএ সরকারের কোনও মন্ত্রীর ইস্তফা হবে না।” সরকারের এই অবস্থানকে তখন অনেকেই তাদের সুদৃঢ় রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক বলে মনে করেছিলেন, যেখানে নীতি ছিল— অভিযোগ উঠলেই মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, বরং তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা।
১১ বছর ধরে সেই ভাবমূর্তি অটুট থাকলেও প্রথম বড় ধাক্কাটি এসেছিল ২০১৮ সালে। সেই বছর ‘মি টু’ (MeToo) আন্দোলনের সময় সাংবাদিক প্রিয়া রমানির করা যৌন হেনস্থার অভিযোগের মুখে পড়ে বিদেশ মন্ত্রকের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরকে নিজের পদ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ আট বছর ধরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আর কোনও মন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হয়নি। সেই সংক্ষিপ্ত তালিকার দ্বিতীয় নাম হিসেবে শনিবার যুক্ত হলো ধর্মেন্দ্র প্রধানের নাম।
এক মাসের আন্দোলন এবং মন্ত্রীর পদত্যাগ
গত ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তর-মন্তরে নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। পরবর্তীতে সেই আন্দোলনে একে একে শামিল হয় দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং লাদাখের প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক (যিনি ২৬ দিন অনশন করেন)। একটানা ২৬ দিনের অনশন, সংসদ অভিযান এবং দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিবাদের জেরে কেন্দ্রের ওপর চাপ চরম আকার ধারণ করে।
শনিবার পদত্যাগের ঠিক আগে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ এক দীর্ঘ পোস্টে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান যে, গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। নিট প্রশ্নফাঁসের দায় তিনি প্রথম দিন থেকেই নিজের কাঁধে নিচ্ছেন বলে উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই পরিস্থিতির সুযোগ যেন কোনও ‘দেশবিরোধী শক্তি’ নিতে না পারে।
বিরোধীদের উল্লাস বনাম বিজেপির প্রতিক্রিয়া
শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগকে ছাত্র আন্দোলনের এক বিরাট ও ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দাবি করেছে বিরোধীরা।
-
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে মন্তব্য করেছেন, “দেশের ছাত্রদের কণ্ঠস্বর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দরজায় পৌঁছেছে। এটি সত্যের জয় এবং সরকারের একগুঁয়ে মনোভাবের পরাজয়।” একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছাত্রসমাজের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন।
-
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই পদত্যাগ তাঁদের ৩৬ দিনের আন্দোলনের মাত্র প্রথম সাফল্য। নিট প্রশ্নফাঁসে আত্মঘাতী বা অবসাদগ্রস্ত ছাত্রছাত্রীদের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত মামলা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।
অন্যদিকে, বিরোধীরা এটিকে সরকারের পরাজয় বলে দাবি করলেও, বিজেপি নেতৃত্ব একে মন্ত্রীর সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতার বিরল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন মন্তব্য করেছেন যে, বৃহত্তর স্বার্থে ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই পদত্যাগ সততা, দায়িত্ববোধ এবং নিঃস্বার্থ জনসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। নিট প্রশ্নফাঁসের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই পদত্যাগ এখন মোদী সরকারের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতেও এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে।