“সবজি বেচেছেন, চালিয়েছেন রিকশা…”-কমনওয়েলথ গেমসে দেশকে প্রথম পদক এনে দিলেন ঝান্ডু কুমার

২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে প্রথম পদক জয় করে নিল ভারত। আর দেশের ঝুলিতে এই ঐতিহাসিক প্রথম পদক এনে দিলেন ২৯ বছর বয়সি প্যারা অ্যাথলিট ঝান্ডু কুমার। বিহারের এই লড়াকু যুবক একসময়ে সংসার চালাতে ই-রিকশা চালিয়েছেন, এমনকি রাস্তার ধারে সবজি বিক্রিও করেছেন। সেই ঝান্ডুই গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত পুরুষদের হেভিওয়েট প্যারা পাওয়ারলিফটিং ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করলেন।
দিনের শুরুতে পুরুষদের লাইটওয়েট বিভাগে ভারতের এক প্রতিযোগী অল্পের জন্য পদক হাতছাড়া করে চতুর্থ স্থানে শেষ করায় কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছিল। তবে সেই হতাশা নিমেষে মুছে দিলেন ঝান্ডু কুমার।
আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স ও পদক জয়
২৯ বছরের এই ভারতীয় অ্যাথলিট অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করেন। তাঁর দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় তিনি সফলভাবে ১৯০ কেজি ওজন তোলেন। এর সুবাদে অর্ধেক প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার সময় ১৩০.৯ পয়েন্ট নিয়ে তিনি তালিকার শীর্ষে উঠে আসেন।
শেষ প্রচেষ্টায় ১৯০ কেজির জায়গায় ১৯৬ কেজি তোলার চেষ্টা করলেও টাইমিংয়ের সামান্য গড়বড়ের কারণে তা সফল হয়নি। বারবেলটি ব়্যাকে আটকে যাওয়ায় অল্পের জন্য শেষ লিফটটি ফসকে যায়। নিজের পারফরম্যান্সে কিছুটা অখুশি থাকলেও তাঁর ১৯০ কেজির সফল লিফট তাঁকে সুরক্ষিত জায়গায় রেখেছিল। ধারাভাষ্যকাররাও তখনই নিশ্চিত হয়ে যান যে এই পয়েন্ট গ্রুপ এ-র প্রতিযোগীদের পক্ষে টপকানো কঠিন হবে এবং ঝান্ডুর পদক নিশ্চিত।
দেশের হয়ে প্রথম পদক জয়ের অনুভূতি প্রকাশ করে ঝান্ডু পিটিআই-কে বলেন, “ভারতের জন্য প্রথম পদক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমি জাতীয় পতাকা দেখি, তখন খুব আনন্দ হয়।”
অভাবের সঙ্গে লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক সাফল্য
বিহারের নালন্দা জেলার হরনৌতে জন্ম নেওয়া ঝান্ডু জন্ম থেকেই পোলিও আক্রান্ত। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে বড় হওয়া ঝান্ডু সংসার চালাতে বাবার সঙ্গে রাস্তার ধারে আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করতেন। পরবর্তীকালে করোনা মহামারির কঠিন সময়ে দৈনিক রোজগারের তাগিদে তাঁকে ই-রিকশাও চালাতে হয়েছে।
২০১৭ সালে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে তাঁর ক্রীড়াজীবন শুরু হয়। প্রথমে এফ-৫৫ বিভাগে শটপুট এবং ডিসকাস থ্রো-তে অংশ নিয়ে জেলা ও রাজ্যস্তরে একাধিক পদক জেতেন তিনি। এরপর জিমে পাওয়ার এক্সারসাইজের সময় পাওয়ারলিফটিংয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায় এবং তিনি এই খেলাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরেছিল ২০২৩ সালে। সেই সময়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার অর্থের সংস্থান করতে নিজের ই-রিকশাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হয়েছিল তাঁকে। সেই টুর্নামেন্টে তিনি একটি সফল লিফটও করতে পারেননি, কিন্তু তাঁর মধ্যে থাকা প্রতিভা ও সম্ভাবনা নজরে আসে প্যারালিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী রাজিন্দর সিং রাহেলুরের। এরপর রাহেলুরের তত্ত্বাবধানে গান্ধীনগরের সাই (SAI) ন্যাশনাল সেন্টার অব এক্সিলেন্স-এ প্রশিক্ষণের সুযোগ পান ঝান্ডু।
এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দ্রুত সাফল্য পেতে শুরু করেন তিনি। ২০২৫ সালে বেজিং বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ জেতার পর, ২০২৬ সালের এশিয়ান অ্যান্ড ওশেনিয়া চ্যাম্পিয়নশিপেও ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন ঝান্ডু কুমার। আর এবার কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চে দেশের প্রথম পদক জয় করে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, অদম্য ইচ্ছা থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিও হার মানতে বাধ্য।