“শুধু অভিষেককে নিয়েই থাকুক দল!” মমতার ধমক খেতেই প্রকাশ্যে চরম বিদ্রোহ কল্যাণের

কালীঘাটে তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের একুশের জুলাইয়ের মঞ্চে লোকসভা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাদানুবাদ’-এর ভিডিও ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মঞ্চে দীর্ঘক্ষণ ধরে ভাষণ দেওয়ায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ওপর প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। আর সেই ঘটনার পরই এবার দলনেত্রীর বিরুদ্ধে নিজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অভিমান একেবারে প্রকাশ্যে উগরে দিলেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নানা ইস্যুতে ‘আল্টিমেটাম’ দিতে দেখা গিয়েছে এই প্রবীণ নেতাকে।
মমতার প্রতি ক্ষোভ ও অভিমানের কথা শোনালেন কল্যাণ
তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ক্ষোভের সুরে বলেছেন, “দিদি শুধু অভিষেক অভিষেক করলে তো প্রবলেম হয়ে যাচ্ছে আমাদের। আমি ওই ৮০ জনের মতো বা আর ২০ জনের মতো নই। মানুষও আমাকে ভালোবাসে, এটুকু মেনে নিতে হবে সবাইকে। এতে কারওর কোনো হিংসার কারণ নেই। আমার জায়গা চলে যাচ্ছে, এটা যদি কেউ ভাবে, তাহলে তার শেষ। এমনিতেও শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষও জানে আমি লড়াই করি। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটা আমি করব এবং দলেই থেকে করব। এদের মতো আমি নই যে ৮০ জন চলে গেছে, ২০ জন চলে গেছে, দরকার হলে দলের মধ্যে ঝগড়া করে হলেও করব। আমিও কাল থেকে অনেক ফোন-মেসেজ পাচ্ছি যে, দাদা দল ছেড়ে যাবেন না। আমি কেন যাব দল ছেড়ে…”
মমতার সঙ্গে মঞ্চের সেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের প্রসঙ্গ টেনে কল্যাণ জানান, “দিদি যখন বসল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি বলব দিদি, বললেন হ্যাঁ তুমি বলো। তা আমি বলে শেষ করেছি। কুণাল এসে দাঁড়িয়েছে। আমি শেষ করেছি। শেষ করতেও তো ২ মিনিট লাগে। মাঝে আমি বললাম, আমি আর বলছি না, ওরা এসে গেছে… সবাই বলছে আপনাকে বলতে হবে। এবার আমি যখন নামছি, তখন দিদি অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে আমাকে বলল, এক ঘণ্টার উপর বক্তৃতা দিচ্ছ… ভীষণ অসম্মানজনকভাবে। তো আমি বললাম আপনাকে এইসব কথা কে কানে দেয়? পাশে তখন অভিষেক, শোভনদেব বসে রয়েছে। কেউ তো কানের মধ্যে গুঁজেছে… আমি উঠেছি ১২টা ৫০-এ, এখন বাজে ১টা ১০… এক ঘণ্টাটা হলো কোথায়? ১টা ১০-১২… তার মধ্যে তো ১০ মিনিট ওখানে চলে গেছে… না আরও অনেক বক্তা আছে… আমায় তো কেউ বলেইনি… লিস্টে তো আর কোনো বক্তার কথা কুণাল আমাকে বলেইনি। এরকমভাবে পাবলিক হিউমিলিটি তো ভালো লাগে না দিনের পর দিন। দিদিকে এটাও বলেছি, আপনার এখানে যখন নেতা আছে, বক্তৃতা দিয়েছে, তারা একটাও গত দু-আড়াই মাসে কোথাও যায়নি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অত বড় লিডার… তো দু’মাস, আড়াই মাস ঘুরল না কেন? শোভনদেব চ্যাটার্জি অত বড় লিডার, ঘুরল না কেন? আমি তো ঘুরেছি সমস্ত রিস্ক নিয়ে… এটা তো মানতে হবে একটা জায়গায় এসে। দিদির যদি মনে হয় অভিষেক এসে বসে আছে কেন, এটা যদি দিদির বিরক্তির কারণ হয়, তাহলে আমাদের ছেড়ে দেওয়া ভালো। শুধু অভিষেককে নিয়েই থাকুক তাহলে। বাংলার কোটি কোটি মানুষ, আর লক্ষ লক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীর জন্য মমতাদি নেত্রী হয়েছেন। কোনো রক্তের সম্পর্কের লোকের জন্য মমতাদি বাংলার নেত্রী হননি।”
নেত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে কল্যাণ আরও বলেন, “নেত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো, নেত্রী আবার অনেকসময় দূরেও সরিয়ে দিয়েছে। নেত্রীর সুসময়ের সময় আমি দূরে। নেত্রীর দুঃখের সময় আমি কাছে। যেই নেত্রী দেখল অত ভিড় হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তি প্রকাশ শুরু করল। দিদির সেই একই থিওরি শুরু হয়ে গেল। নেত্রীর সুসময়ে ববি হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অরূপ বিশ্বাস, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় – এরা সবাই আছে। নেত্রীর খারাপ সময়ে তো আমি একা রয়েছি। আর জি করের সময় দলের মধ্যে থাকা কোনো নেতা মমতাদিকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে চেয়েছিল। এটা সত্য, এটা বাস্তব। সেই বাস্তবটা যদি না মানতে হয়… সেদিন আমি আর কুণাল দিদির পাশে ছিলাম, আর কেউ ছিল না।”
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে ঘড়ির কাঁটার হিসাব দিয়ে কল্যাণ বলেন, “১২টা ৪৫-এ মেসেজ করেছি। তার ৫ মিনিট পর বসেছি… মঞ্চ থেকে নামার সময় বাদানুবাদ হয়েছে দিদির সঙ্গে, আপনারা দেখেছেন। তারপর নেমে ১টা ১৫-তে মেসেজ করেছি, আপনাদের দেখাবো না। তাহলে ১২টা ৪৫ থেকে ১টা ১৫, কতক্ষণ হলো? দিদি ঘড়ি দেখালেই মেনে নেব? আমি দিদিকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, দিদির জন্য সবকিছু করতে রাজি আছি। কিন্তু দিদিকেও রিজনেবল হতে হবে। দিদির অত ঘনঘন বিরক্ত হলে হবে না। দিদি যদি মনে করে যা ইচ্ছে তাই বলবে, তা হবে না। দিদি যদি মনে করে যখন ইচ্ছে পাবলিকলি বিরক্তি দেখাতে পারি, তাও হবে না। আর দিদি যদি মনে করে অভিষেক আর ডেরেক যা বলবে, তাই হবে, তাতেও হবে না।”