২৫ দিনে পা দিল সোনম ওয়াংচুকের অনশন! আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন পরিবেশকর্মীর শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে বড় আপডেট

লাদাখের প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন বুধবার অত্যন্ত সংকটজনক ও গুরুত্বপূর্ণ ২৫তম দিনে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে চলা এই অনশনের তীব্র প্রভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে, যার জেরে বর্তমানে তাঁকে গুরুগ্রামের বিখ্যাত মেদান্ত হাসপাতালের আইসিইউ (ICU)-তে রেখে কড়া পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা চলছে। তবে শারীরিক চরম দুর্বলতা সত্ত্বেও নিজের অনশনের দাবিতে তিনি এখনও সম্পূর্ণ অনড় রয়েছেন বলেই হাসপাতাল সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আইসিইউ-তে স্থানান্তর ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ
গত ২১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট নাগাদ দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল থেকে একটি বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে করে সোনম ওয়াংচুককে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেই সময় রাজধানী দিল্লির বিভিন্ন প্রধান এলাকায় বিরোধী দলগুলির বিক্ষোভ, যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলন এবং দিল্লি সীমান্তে কৃষকদের জোরদার আন্দোলনের জেরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণত সফদরজং থেকে মেদান্ত পৌঁছাতে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগলেও, তীব্র যানজটের কারণে সেদিন অ্যাম্বুলেন্সটি পৌঁছাতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় নেয়।
এদিকে, মেদান্ত হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে এবং মানসিকভাবেও তিনি অত্যন্ত দৃঢ় রয়েছেন। এদিকে, মঙ্গলবার গভীর রাতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং অপর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং সরাসরি মেদান্তের আইসিইউতে গিয়ে সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ সাক্ষাৎ করেন। প্রায় ১০ মিনিট ধরে চলা এই গোপনীয় বৈঠকে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, তা এখনও সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি বৈঠকের সময় নিরাপত্তার খাতিরে চিকিৎসকদেরও আইসিইউ কক্ষের বাইরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আইনি জয় ও আদালতের নির্দেশ
উল্লেখ্য, মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তরিত হওয়ার ঠিক আগেই দিল্লি হাইকোর্টে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইয়ে বড় জয় পেয়েছিলেন সোনম ওয়াংচুক। আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশের ফলেই তাঁকে নিজের পছন্দমতো হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর আগে অনশনের একুশতম দিনে দিল্লি পুলিশ তাঁকে জোর করে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করেছিল।
চিকিৎসকদের কড়া নজরদারি ও শারীরিক জটিলতা
বর্তমানে চিকিৎসকদের একটি বিশেষ ও অভিজ্ঞ দল সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার ওপর ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছেন। সম্প্রতি তাঁর বেশ কিছু নতুন রক্ত পরীক্ষাও (Blood Test) করানো হয়েছে এবং সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী চিকিৎসা পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হবে। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, সমস্ত রিপোর্ট সন্তোষজনক এলে আজ, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই তাঁকে আইসিইউ থেকে সাধারণ কেবিনে স্থানান্তর করা হতে পারে।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, টানা ২৫ দিন ধরে খাবার না খাওয়ার ফলে মানবদেহ প্রথমে শরীরে সঞ্চিত শর্করা এবং পরবর্তীতে শক্তির জোগান দিতে চর্বি পোড়াতে শুরু করে। এরপর দেহের প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ তৈরির জন্য শরীর নিজের পেশির প্রোটিন ভাঙতে বাধ্য হয়, যার ফলে অত্যন্ত দ্রুত ওজন হ্রাসের পাশাপাশি পেশিশক্তিও মারাত্মকভাবে কমে যায়।
বর্তমানে চিকিৎসকদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হল তাঁর রক্তে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মাত্রা। কারণ এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে মারাত্মকভাবে অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন অনশন চলার পর হঠাৎ স্বাভাবিক খাবার শুরু করলে ‘রিফিডিং সিনড্রোম’-এর মতো প্রাণঘাতী শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর সেই কারণেই অত্যন্ত চরম সতর্কতা ও নিখুঁত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। এখন সকলের নজর তাঁর নতুন রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট এবং পরবর্তী শারীরিক পরিস্থিতির দিকেই।