একুশে জুলাই এখন চতুর্মুখী রাজনৈতিক লড়াই! তৃণমূলের ভাঙন থেকে বিজেপির মাস্টারস্ট্রোক—বদলে গেল শহিদ দিবসের সমীকরণ!

বছরের পর বছর ধরে তিলোত্তমা কলকাতায় ২১ জুলাইয়ের অর্থ ছিল কেবল একটিই ছবি—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র ও জমজমাট শহিদ দিবস পালন। রাজ্যের দূরদূরান্ত থেকে লাখ লাখ তৃণমূল কর্মী-সমর্থক কলকাতায় এসে ভিড় জমাতেন, আর ধর্মতলার মেয়ো রোড বা ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে আয়োজিত জনসমুদ্র থেকে আগামী দিনের রাজনৈতিক রূপরেখা ঘোষণা করতেন তৃণমূল সুপ্রিমো। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই পরিচিত ইতিহাসে এসেছে আমূল ও ঐতিহাসিক বদল। রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের জেরে এ বারের ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস কার্যত চারমুখী রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
১. তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও চার শিবিরের লড়াই
এবারের একুশে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তৃণমূল কংগ্রেসের নিদারুণ অভ্যন্তরীণ বিভাজন। দল ভেঙে বর্তমানে একাধিক ধারা তৈরি হয়েছে:
মমতা-অভিষেকের শিবির: ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভার অনুমতি না মেলায় আদালতের নির্দেশে এবার বিড়লা তারামণ্ডলের কাছে সমাবেশ করছে মূল বা কালীঘাট তৃণমূল শিবির।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির: বিরোধী দলনেতা তথা বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের প্রকৃত প্রতিনিধি বলে দাবি করছে। ‘আসল’ তৃণমূলের স্বীকৃতি চেয়ে তাঁরা মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির কাছে পৃথক কর্মসূচি পালন করছেন।
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের শিবির: দলের ২০ জন সাংসদকে নিয়ে গঠিত এই গোষ্ঠী দিল্লির রাজঘাটে গিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
কংগ্রেসের স্বতন্ত্র অবস্থান: তৃণমূলের এই ভাঙনকে হাতিয়ার করে কংগ্রেসও তাদের পুরনো ইতিহাস ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছে।
২. কংগ্রেসের ইতিহাস ফেরানোর লড়াই
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাটি মূলত তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন যুব কংগ্রেসের আন্দোলন ছিল। সেই দিন ভোটার পরিচয়পত্রকে একমাত্র বাধ্যতামূলক নথি করার দাবিতে রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করে ওই ঘটনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিজেদের দখলে নেন।
তবে এ বার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং বর্ষীয়ান নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী পরিষ্কার ভাষায় দাবি করেছেন যে, ওই আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে যুব কংগ্রেসের পতাকার তলায় হয়েছিল। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শুভঙ্করবাবু শর্ত দেন যে, অতীতে কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল গড়া যে রাজনৈতিক ভুল ছিল, তা স্বীকার করতে হবে।
৩. তদন্ত কমিশন ও বিজেপি সরকারের মাস্টারস্ট্রোক
এবারের একুশে জুলাইয়ের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোকটি দিয়েছে রাজ্যের বর্তমান বিজেপি সরকার। শহিদ দিবসের প্রাক্কালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রিপোর্ট পেশ করেন।
রিপোর্টের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শুভেন্দু বাবু অভিযোগ করেন যে, ২০২৪ সালে হাতে পাওয়ার পরও তৎকালীন তৃণমূল সরকার রাজনৈতিক কারণে সেই রিপোর্ট গোপন রেখেছিল এবং নিহতদের পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কমিশন নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়িত করা হয়নি। বর্তমান বিজেপি সরকার মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অবিলম্বে সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে নতুন করে এফআইআর ও আইনি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে, পুলিশের গুলিচালনাকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও উসকানিহীন’ বলে উল্লেখ করে তৎকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি।
হাইকোর্টের কড়া নজরদারি ও নিরাপত্তা
একাধিক রাজনৈতিক দলের পৃথক কর্মসূচি ও পূর্ববর্তী রাতে সভামঞ্চ ভাঙচুরের অভিযোগের জেরে কলকাতার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট এই বিষয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, আদালতের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিটি সভার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে সমাবেশস্থলের নিরাপত্তা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, এ বারের একুশে জুলাই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের বার্ষিক স্মরণসভা নয়; বরং এটি তৃণমূলের অস্তিত্ব রক্ষা, ঋতব্রতের দল ভাঙার লড়াই, কংগ্রেসের শেকড় খোঁজার প্রচেষ্টা এবং বিজেপির আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে এক হাই-ভোল্টেজ ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।