ইলেকট্রিক গাড়িতেও গর্জে উঠবে ভি৮ ইঞ্জিনের রোমাঞ্চ! বেন্টলির মাস্টারস্ট্রোক দেখে চোখ কপালে উঠবে

বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) চাহিদা যেভাবে হু হু করে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বের প্রথম সারির বিলাসবহুল গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলো এখন ইভি বাজার ধরতে জোরকদমে ময়দানে নেমে পড়েছে। কিন্তু এমন এক পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যবাহী লাক্সারি কার ব্র্য়ান্ডগুলির সামনে এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যে সমস্ত সংস্থার প্রিমিয়াম গাড়িগুলি তাদের নজরকাড়া ডিজাইন, দুর্দান্ত হ্যান্ডলিং এবং শক্তিশালী ইঞ্জিনের গর্জন বা শব্দের জন্যই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তাদের ক্ষেত্রে নিঃশব্দ ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরি করা এক বড় পরীক্ষা। আর এই সমস্যার অভিনব সমাধান করতে ব্রিটিশ বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা সংস্থা ‘বেন্টলি’ (Bentley) তাদের অত্যন্ত প্রতীক্ষিত প্রথম ইলেকট্রিক গাড়ি ‘টরকাল’ (Torqueal) সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ও চমকপ্রদ আঙ্গিকে বাজারে নিয়ে আসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ি সাধারণত একেবারে নিঃশব্দে চলাচল করলেও, বেন্টলি চাইছে তাদের কাস্টমাররা প্রথম ইভি চালানোর সময়ও ঠিক সেই একই শিহরণ ও রোমাঞ্চ অনুভব করুক, যা তাঁরা এতদিন তাদের ঐতিহ্যবাহী V8 এবং W12 ইঞ্জিনের গাড়িতে পেয়ে অভ্যস্ত ছিলেন।
গ্রাহকদের এই অভাবনীয় ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা দিতেই কোম্পানিটি বিশেষভাবে তৈরি করেছে “বেন্টলি ডাইনামিক সিম্ফনি” (Bentley Dynamic Symphony) নামের একটি অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। এটি কোনো গতানুগতিক কৃত্রিম ইঞ্জিনের মেকি আওয়াজ নয়, বরং ড্রাম এবং গিটারের মতো আসল বাদ্যযন্ত্রের সরাসরি ব্যবহার করে তৈরি এক জাদুকরি সুর, যা চালককে চোখের নিমেষে খাঁটি ইঞ্জিনচালিত বেন্টলি চালানোর আসল অনুভূতি উপহার দেবে।
ড্রামারকে সামনে রেখে বেন্টলির এক অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় পরীক্ষা
সম্পূর্ণ ইউনিক এই ইঞ্জিন সাউন্ডের রিংটোন বা সুর তৈরি করার জন্য বেন্টলির প্রকৌশলীরা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এক পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নেন। ল্যাবের একপাশে ক্লাসিক ভি৮ ইঞ্জিনের আসল গর্জন বাজানো হয় এবং ঠিক তার বিপরীতে একজন পেশাদার ড্রামারকে ড্রাম বাজাতে বলা হয়। এরপর কোম্পানির বিশেষজ্ঞ টিম উভয় শব্দের মধ্যে গভীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ চালায়।
তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, গাড়ির ইঞ্জিন এবং ড্রামের ছন্দের মধ্যে শক্তির যে মেলবন্ধন, তার মধ্যে দারুণ এক মিল রয়েছে। বেন্টলির মতে, ঠিক যেমন একজন দক্ষ ড্রামার পারফর্ম করার সময় নিখুঁতভাবে প্রতিবার হুবহু একই তালে ড্রাম বাজান না, তেমনই একটি পাওয়ারফুল পেট্রোল ইঞ্জিনের অ্যাক্সিলারেটরের শব্দেও অতি সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন ঘটে। আর মানুষের মন মূলত এই প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও ছন্দের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়ে।
আসল বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তৈরি এক্সক্লুসিভ সুর
এই গবেষণার পরেই সংস্থার মিউজিশিয়ান ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা ড্রাম, ভায়োলা এবং বেস গিটারের মতো রিয়েল বাদ্যযন্ত্রের নিখুঁত সংমিশ্রণে একটি ব্র্যান্ড নিউ সাউন্ড ট্র্যাক তৈরি করেন। কোম্পানির সাফ কথা, এর মূল উদ্দেশ্য সাধারণ ইঞ্জিনের আওয়াজকে অন্ধের মতো নকল করা নয়, বরং চালককে একটি সাধারণ ইলেকট্রিক বেন্টলি চালানোর সময়ও ঠিক সেই পুরনো রোমাঞ্চ ও অ্যাড্রিনালিন রাশ উপহার দেওয়া, যা তাঁরা এতদিন পেট্রোল গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে পেতেন।
ড্রাইভিং স্টাইল অনুযায়ী বদলাবে সাউন্ডের ফ্রিকোয়েন্সি
বেন্টলির এই নতুন প্রজন্মের সাউন্ড টেকনোলজি চালকের অ্যাক্সিলারেটর প্রেস করার কায়দা এবং ড্রাইভিং স্টাইলের সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের মানিয়ে নেবে। গাড়ির বর্তমান গতিবেগ এবং চালকের মোড় ঘোরানো বা স্পিড বাড়ানোর ধরন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এই বিশেষ সুরেরও স্বর বা টোন পরিবর্তিত হতে থাকবে। বলাই বাহুল্য, এটি স্টিয়ারিংয়ের পিছনে থাকা চালকের জন্য ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাকে আরও অনেক বেশি ইন্টারেক্টিভ, জীবন্ত এবং প্রিমিয়াম করে তুলবে।
নতুন টেকনোলজি ও কুলীন ঐতিহ্যের পারফেক্ট ব্লেন্ড
বেন্টলির মতো হাই-এন্ড ব্র্যান্ডের কাছে ‘টরকাল’ কেবল তাদের প্রথম ইলেকট্রিক এসইউভি-ই নয়, বরং নিঃশব্দ ইলেকট্রিক যুগেও কোম্পানির নিজস্ব রাজকীয় স্বকীয়তা ও ডিএনএ বজায় রাখার এক ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা। যেখানে বাজারের বেশিরভাগ ইভি প্রস্তুতকারক সংস্থাই গাড়িগুলিকে সম্পূর্ণ শব্দহীন বা সাইলেন্ট রাখতে পছন্দ করে, ঠিক সেখানে বেন্টলি মিউজিক এবং টেকনোলজির দারুণ ফিউশনে নিজেদের গাড়িগুলোকে ভিড়ের মাঝেও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে তুলতে বদ্ধপরিকর। কোম্পানির দৃঢ় বিশ্বাস, এই ইউনিক প্রযুক্তির হাত ধরেই তাদের প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়িটি পুরোনো দিনের ইঞ্জিনচালিত বিলাসবহুল গাড়িগুলির মতোই চালকদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেবে।
কোথা থেকে এল এমন দুর্দান্ত আইডিয়া?
পুরো আইডিয়াটার পিছনের ইতিহাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে বেন্টলির ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন যে, শুরুতে তাঁরা কোম্পানির সর্বকালের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় ভি৮ ইঞ্জিনের আসল শব্দকে অত্যন্ত গভীরভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্টাডি করেন। তখনই তাঁরা আবিষ্কার করেন যে, মানুষ মূলত কেবল ইঞ্জিনের শব্দের তীব্রতার জন্যই আকৃষ্ট হয় না, বরং তার গভীরে থাকা নিজস্ব ছন্দ, বিট এবং হাই-স্পিডের রোমাঞ্চকর অনুভূতির সঙ্গেই তাদের মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র থাকে। আর এই উপলব্ধি থেকেই বেন্টলির গবেষকরা তাদের নতুন যুগের ইলেকট্রিক ভেহিকেলের জন্য এই দারুণ সাউন্ড কনসেপ্ট তৈরি করার আইডিয়া পান।