দিল্লির পর এবার পাটনায় রণক্ষেত্র! ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল, উত্তাল দেশ

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং দেশজুড়ে লাগাতার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভের আগুন এবার ছড়িয়ে পড়ল সুদূর বিহারের রাজধানীতেও। গত সোমবার রাজধানীর বুকে সংসদ অভিমুখে আয়োজিত ছাত্র মিছিলে পুলিশি বর্বরতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদে এবং কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর, এবার বুধবার পাটনার রাজপথেও নেমে এল বিশাল ছাত্র বিক্ষোভ। আর এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই পাটনা চত্বর একপ্রকার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ করে পুলিশ।
পাটনায় আইসা-র বিক্ষোভে ধুন্ধুমার ও পুলিশের লাঠিচার্জ
দিল্লিতে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর নির্মম পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার পাটনার রাজপথে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ বা আইসা (AISA)-র ব্যানারে এক তীব্র বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনকারীরা মিছিল করে এগোতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে উভয়ের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষ বাধে।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছুড়তে শুরু করেন, যার জেরে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মী মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ময়দানে নামে পুলিশও। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে উপর্যুপরি লাঠিচার্জ করা হয় এবং মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।
দিল্লির অশান্তি ও আন্দোলনের দ্বিতীয় মাস
এর আগে গত সোমবার রাজধানী দিল্লিতে নিট-ইউজি (NEET-UG) ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভকারী ও শিক্ষার্থীদের সংসদ পদযাত্রা চলাকালীন পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল। যার জেরে সোমবার রাজধানী জুড়ে ভয়ানক হিংসাত্মক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ধস্তাধস্তিতে উভয় পক্ষেরই বহু মানুষ গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে শতাধিক ছাত্রছাত্রী ও পুলিশকর্মীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
রাজধানীর এই চরম সহিংসতার পর থেকেই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী গোটা এলাকায় কঠোর নজরদারি শুরু করেছে। প্রথম দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীরা সাময়িকভাবে সংসদ অভিযান স্থগিত রাখলেও, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ব্যানারে আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তরে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘট অব্যহত রেখেছেন। এমনকি রাতভর বিক্ষোভস্থলে নতুন করে বহু সমর্থক জড়ো হন এবং বাইরে থেকে আসা খাবার ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ আন্দোলন ইতিমধ্যেই সফলভাবে তার দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করেছে।
রাজধানী জুড়ে মেগা নিরাপত্তা ও ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ
এদিকে, জনতা পার্টি এবং যুব কংগ্রেসের পৃথক বিক্ষোভের আশঙ্কা মাথায় রেখে দিল্লি পুলিশ ও প্রশাসন আগে থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। গোটা নয়াদিল্লি ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে জারি করা হয়েছে হাই অ্যালার্ট। দিল্লির অত্যন্ত সংবেদনশীল লুটিয়েন্স এলাকায় বসানো হয়েছে নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
সরকারি সূত্র মারফত জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো মূল্যে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, রফি মার্গ, পার্লামেন্ট মার্গসহ রাজধানীর সমস্ত স্পর্শকাতর পয়েন্টে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ চত্বরগুলিতে আগে থেকেই বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হচ্ছে। দিল্লির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সংবেদনশীল জোনে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দাঙ্গা দমন ইউনিট, কুইক রেসপন্স টিম (QRT) এবং রিজার্ভ ফোর্সকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, জনরোষ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে রাজধানীর পাতাল রেল বা মেট্রো পরিষেবাতেও বড়সড় কড়াকড়ি এনে রাজীব চকসহ মোট ১৬টি স্পর্শকাতর মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।