“ডিজিপির কাছে সাহায্য চেয়েও পাইনি, থানা ঘেরাও করছে দুষ্কৃতীরা!” আদালতে বিস্ফোরক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়!

রাজনৈতিক হিংসা ও জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ফের একবার কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) নজর কাড়ল রাজ্যে একের পর এক ডিম ছোড়ার ঘটনা। সোমবার এই সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) সওয়াল করতে গিয়ে দাবি করেন যে, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি তো হয়নিই, বরং উলটে জনপ্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার প্রবণতা ও আক্রমণ আরও বহুলাংশে বেড়ে গিয়েছে। কল্যাণের করা এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ শোনার পরেই ৩০ জুনের পর ঘটে যাওয়া নতুন সমস্ত ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও নথি আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
আদালতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক অভিযোগ
এদিন মামলার শুরুতেই আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আদালতকে জানান, “ডিম ছোড়ার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এমনকি মহিলা সাংসদকেও ডিম ছোড়া হয়েছে। ডিজিপির কাছে সাহায্য চেয়েও কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি।” কল্যাণ আদালতে আরও অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে রাজ্যে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা বা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের চত্বর থেকে শুরু করে স্থানীয় থানা—কোথাও নিরাপত্তা মিলছে না। এমনকি কোনো ঘটনার অভিযোগ জানাতে থানায় গেলেও সেখানে ১৫ থেকে ২০ জন দুষ্কৃতী তাঁদের ঘিরে ধরে হুমকি দিচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিন নিজের বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলের একাংশের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়েও আদালতের সামনে সরব হন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, “এক রাজ্যের মন্ত্রী বলছেন, ডিম না ছুড়ে পাথর ছুড়ুন! আর এক মন্ত্রী বলছেন, আমি কি মঞ্চে নৃত্য করতে বলব?”
এরপর নিজের একটি ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও বিচারপতিদের সামনে তুলে ধরে কল্যাণ জানান, গত রবিবার মুর্শিদাবাদ যাওয়ার পথে হরিণঘাটায় তাঁর গাড়ি বিকল হলে (চাকা পাংচার হলে) তাঁকে দাঁড়াতে হয়। সেই সুযোগেই তাঁকে ঘিরে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয় এবং ডিম ছোড়ার হুমকি দেওয়া হয়। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “পুলিশের জন্য নতুন করে গাইডলাইন করে লাভ কী হবে, যখন পুলিশ নিজের কাজটাই করছে না!”
আদালতের নির্দেশ ও রাজ্যের বক্তব্য
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সমস্ত জোরালো বক্তব্য শোনার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ জানতে চায় যে, গত ৩০ জুনের পর থেকে রাজ্যে ঠিক কতগুলি নতুন ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার সঠিক তথ্য জনস্বার্থ মামলাকারীদের হলফনামার (Affidavit) মাধ্যমে আদালতে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে আগামী চার সপ্তাহ পরে এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি শুনানির সময় বলেন, “ঘটনা যদি সত্যিই বেড়ে থাকে, তবে তার উপযুক্ত নথি বা প্রমাণ দেখান এবং কটি নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে তা জানান।”
অন্যদিকে, রাজ্যের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল (AAG) রাজদীপ মজুমদার আদালতকে জানান যে, রাজ্য ইতিমধ্যে এই বিষয়ে তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিয়েছে এবং পুলিশের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা বা গাইডলাইনও তৈরি করা হয়েছে। কল্যাণবাবু যে সমস্ত নতুন ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, তার হয়তো অধিকাংশই রাজ্যের জমা দেওয়া এই রিপোর্টে স্থান পেয়েছে।
সব পক্ষের সমস্ত বক্তব্য ও যুক্তির শুনানির পর ডিভিশন বেঞ্চ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, “জনস্বার্থ মামলাকারী হোক কিংবা রাজ্য সরকার—সকল পক্ষই চাইছে রাজ্যে এই ধরনের ডিম ছোড়া ও বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। তাই নতুন করে ঘটে চলা ঘটনাগুলির সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত বিবরণ লিখিতভাবে জমা দেওয়া হোক।” আদালতের এই নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী শুনানির আগে ৩০ জুনের পর ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনার নথিপত্র একত্রিত করে আদালতে পেশ করতে হবে। সেই প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী শুনানিতে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আরও বড় পর্যালোচনায় নামবে আদালত।