৬০ হাজারে আটকে গেল প্রাণ! আবাস প্রকল্পে বাকি টাকার অপেক্ষায় নিভে গেল কোলের প্রদীপ, তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক

বর্ষার শুরুতেই ফের একবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল আবাস দুর্নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার মারাত্মক অভিযোগ। এবার এক নিষ্পাপ শিশুর বলিদান প্রত্যক্ষ করল বাঁকুড়া। আবাস যোজনার তালিকায় নাম থাকলেও মেলেনি সম্পূর্ণ টাকা। ফলে বাধ্য হয়েই জরাজীর্ণ নড়বড়ে মাটির ঘরে দিন কাটাতে হচ্ছিল পরিবারটিকে। আর বর্ষার মরশুমে সেই নড়বড়ে দেওয়াল ভেঙেই মাত্র ২ বছর বয়সে প্রাণ হারাল এক শিশু। মঙ্গলবার সকালে ঘটনাটি ঘটেছে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর ব্লকের আমডহরা গ্রামে। মৃত শিশুর নাম তামিম খান। পরিবারের অভিযোগ— যথাসময়ে আবাস প্রকল্পের পুরো টাকা মিললে আজ হয়তো এভাবে সন্তানকে হারাতে হত না তাঁদের।

কীভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক ঘটনা?
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিষ্ণুপুর ব্লকের আমডহরা গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে মাটির বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করেন নিম্বর খান। অভিযোগ, তৃণমূল জমানায় বারবার আবাসের আবেদন করেও স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির কারণে তাঁর ভাগ্যে ঘর জোটেনি। বিগত বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তালিকায় নাম উঠলেও, প্রথম কিস্তির মাত্র ৬০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি। সেই সামান্য টাকায় ঘরের ভিতটুকু তুলতেই শেষ হয়ে যায়। এরপর আর বাকি কিস্তির টাকা সরকারি দফতর থেকে ছাড়া হয়নি। ফলে মাঝপথেই থমকে যায় পাকা বাড়ি তৈরির কাজ।

অগত্যা সেই ভাঙাচোরা, বিপজ্জনক মাটির ঘরেই দিন গুজরান করছিল পরিবারটি। মঙ্গলবার সকালে যখন ঘরের ভিতর নিম্বর খানের পরিবারের সদস্যরা ও এক প্রতিবেশী বসে চা খাচ্ছিলেন, তখনই ঘটে সেই চরম বিপর্যয়। দিনকয়েক ধরে চলা টানা বৃষ্টিতে মাটির দেওয়ালটি সম্পূর্ণ আলগা হয়ে গিয়েছিল। সকালের দিকে হঠাৎই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গোটা দেওয়ালটি।

ধ্বংসস্তুপের নীচে চাপা পড়ে যান নিম্বর খানের পুত্রবধূ মাহেদা খান, নাতনি রুমা খান, প্রতিবেশী রিয়া চৌধুরী এবং ২ বছরের নাতি তামিম খান। চিৎকার শুনে ছুটে আসেন প্রতিবেশীরা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে বিষ্ণুপুর সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা শিশু তামিমকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বাকি আহতরা বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

স্বজনদের কান্না আর একরাশ প্রশ্ন!
মৃত শিশুর এক আত্মীয় কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,

“আমরা সবাই আশেপাশেই ছিলাম। হঠাৎ দেওয়ালটা ভেঙে পড়ল। ৫ জনকে আমরা চাপা পড়া অবস্থা থেকে টেনে বার করি। কিন্তু বাচ্চাটাকে আর বাঁচাতে পারলাম না।”

অন্য এক ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীর বক্তব্য,

“৬০ হাজার টাকায় কি আজ পাকা বাড়ি হয়? অর্ধেকেরও কম টাকা দিয়ে বাকি টাকা আটকে রাখল সরকার। এদিকে টানা বৃষ্টিতে মাটির বাড়িটা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?”

উঠছে বড় প্রশ্ন: আবাস যোজনার টাকা গেল কোথায়?
বিষ্ণুপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এ রাজ্যে আবাসের বেহাল দশা। প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়ার পর কেন মাসের পর মাস বকেয়া পড়ে রইল বাকি টাকা? কার গাফিলতিতে মাঝপথেই বন্ধ রাখতে হল ঘরের কাজ?

রাজনৈতিক মহলের মতে, একদিকে যখন আবাস দুর্নীতি নিয়ে রাজ্য-কেন্দ্র টানাপোড়েন চলছে, অন্যদিকে তখন খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ও দরিদ্র মানুষকে। উল্লেখ্য, এই ঘটনার আবহেই আজ মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রের তরফে আরও ১ লক্ষ বাড়ির টাকা দেওয়া হয়েছে এবং বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে শুভেন্দু অধিকারীর এই আশ্বাসের মাঝেই বিষ্ণুপুরের এই ঘটনা রাজ্য প্রশাসনের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *