“দেশি নয়, জিলিপি আসলে বিদেশি!”-জানেন কী ইতিহাস লুকিয়ে এই মিষ্টির অন্দরে?

গরম গরম জিলিপি! নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রসে টইটম্বুর, প্যাঁচানো এক অমৃতের ছবি। রবিবার সকালের জলখাবার হোক বা শীতের সন্ধেবেলা—এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সঙ্গে জিলিপির জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু জানেন কি, আপনার এই প্রিয় মিষ্টিটি আসলে খাঁটি ‘দেশি’ নয়? অবাক হলেও এটাই সত্যি, জিলিপির শিকড় আমাদের এই মাটির অনেক দূরে, সুদূর পারস্যের মরু প্রান্তরে।

পারস্যের ‘জুলবিয়া’ যখন জিলিপি
জিলিপির আদি নিবাস আজকের ইরান, যা একসময়ে পরিচিত ছিল ‘পারস্য’ বা ‘পার্সিয়া’ নামে। সেখানে এই মিষ্টির নাম ছিল ‘জুলবিয়া’ (Zulbia) বা ‘জলাবিয়া’। ত্রয়োদশ শতকের আশেপাশে পারস্যের অলিগলিতে এই মিষ্টির দারুণ কদর ছিল। তৎকালীন বণিকরা ব্যবসার প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে যখন ভারতের দিকে পা বাড়ালেন, তখনই তাঁদের ঝোলায় করে এই মিষ্টির রেসিপি পৌঁছে গেল হিন্দুস্তানে।

সংস্কৃত পুঁথিতে ‘কুন্ডলিকা’
ইতিহাসের গবেষক পি. কে. গোড়ে ১৯৪৩ সালে এক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, কীভাবে পারস্যের ‘জুলবিয়া’ শব্দটা সময়ের স্রোতে বদলে হয়ে গেল ‘জিলিপি’। শুধু তাই নয়, মধ্যযুগীয় ভারতের বিভিন্ন সংস্কৃত গ্রন্থ—যেমন ‘গুণগুণবোধিনী’ এবং বেশ কিছু জৈন পাণ্ডুলিপিতে এই মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায় ‘কুন্ডলিকা’ নামে। কেউ কেউ আবার একে ‘জলা-বল্লিকা’ বলেও ডাকতেন। অর্থাৎ, এ দেশে আসার পর থেকেই ভারতীয় রসুইয়ে জিলিপি নিজের জাদু দেখাতে শুরু করেছিল।

দেশি কারিগরদের জাদুতে পাল্টে গেল স্বাদ
বিদেশ থেকে এলেও, জিলিপিকে খাঁটি ভারতীয় করে তুলেছেন আমাদের দেশেরই রাঁধুনিরা। পারস্যের মূলে ছিল মূলত চিনির সিরা আর ময়দার সংমিশ্রণ। কিন্তু ভারতীয় কারিগররা এতে যোগ করলেন ‘ফার্মেন্টেশন’ বা গাঁজন প্রক্রিয়ার কারসাজি। টক দই বা খামির ব্যবহার করে জিলিপির গোলার যে টেক্সচার তৈরি করা হলো, তাতে তা হয়ে উঠল মুচমুচে আর ভেতর থেকে একদম নরম। এই বিশেষ ভারতীয় ‘তড়কা’ই জিলিপিকে দিল তার আসল পরিচিতি।

রাজকীয় পাত থেকে রাস্তার মোড়ে
মোগল আমলের রাজকীয় ভোজ থেকে শুরু করে সাধারণের রাস্তার ধারের দোকান—জিলিপির জনপ্রিয়তা কখনো কমেনি। এর বড় কারণ এর সহজলভ্যতা। আজ দেশের এক এক প্রান্তে জিলিপির এক এক রূপ। কোথাও তা রসে ডোবানো, কোথাও আবার ঘন ক্ষীর বা রাবড়ির সঙ্গে তার মাখামাখি। উত্তর ভারতের ‘জলেবি-রাবড়ি’ কিংবা আমাদের চেনা ‘জিলিপি-সিঙাড়া’—এই কম্বো তো বাঙালির মন জিতে নিয়েছে বহু আগেই।

পারস্যের মরুভূমি থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ ভারতের প্রতিটি বাড়ির খুশির অনুষ্ঠানে মিলেমিশে একাকার। দেশি না বিদেশি, সেই তর্কে আজ আর কেউ যায় না। কারণ, শেষ পাতে গরম জিলিপি মানেই তো এক টুকরো অমৃত!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *