কলার পেটে লুকিয়ে থাকা এই কালো বিন্দুর আসল রহস্য কী? কারণটা জানলে চমকে উঠবেন আপনিও!

আমরা বাজার থেকে যে মিষ্টি ও নরম কলা কিনে খাই, তার ঠিক মাঝখানে ছোট ছোট কালো বিন্দুর মতো কিছু দানা দেখতে পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করেন এগুলোই কলার আসল বীজ এবং এগুলো মাটিতে পুঁতলে হয়তো নতুন কলাগাছ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু আধুনিক কৃষি গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা! এই সাধারণ কলার ভেতরের দানাগুলো থেকে কোনোভাবেই নতুন কোনো গাছ গজিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, গাছ যদি না-ই হয় তবে কলার পেটে এই দানাগুলো অনর্থক কেন বছরের পর বছর ধরে রয়ে গিয়েছে?

কলার পেটে মানুষের ‘অ্যাপেন্ডিক্স’!
বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের শরীরে থাকা অপ্রয়োজনীয় ‘অ্যাপেন্ডিক্স’ অঙ্গটির মতোই কলার ভেতরের এই কালো বিন্দুগুলো আসলে অবিকশিত বা মৃত বীজ। আদিম যুগে কলার যে আসল রূপ ছিল, এই কালো দানাগুলো কেবল সেই ফেলে আসা ইতিহাসের অবশিষ্টাংশ।

ফিরে দেখা ইতিহাস:
প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া আদি বন্য কলায় (যেমন: মুসা একুমিনাটা) জন্মের সময় আঙুলের ডগার মতো বড় বড় এবং পাথরের মতো শক্ত বীজ থাকত। জঙ্গল বা পাহাড়ি পরিবেশে সেই বন্য কলার শক্ত বীজ মাটিতে পড়লে তা থেকে প্রাকৃতিকভাবেই ১০০% নতুন কলাগাছের জন্ম হতো। বনের পশুপাখিরা সেই কলা খেয়ে মলত্যাগের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে বীজ ছড়িয়ে দিত।

মানুষ যেভাবে বদলে দিল প্রকৃতির নিয়ম
বন্য কলার সেই শক্ত বীজের কারণে ফলটি খাওয়ার উপযোগী ছিল না। তাই হাজার হাজার বছর আগে মানুষ কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে কলার জাত বদলাতে শুরু করে। প্রকৃতির বুকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া ক্রোমোজোমের এক অদ্ভুত মিউটেশন বা ত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ এমন কিছু কলাগাছ খুঁজে বের করে, যার ফল অত্যন্ত সুস্বাদু কিন্তু বীজগুলো পরিপক্ক হয় না। মানুষ তখন সেই বিশেষ বীজহীন গাছগুলোকে বেছে নিয়ে নিজেদের সুবিধামতো আলাদাভাবে চাষ করতে শুরু করে।

আমরা আজ যে বাণিজ্যিক কলা খাই, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে সেগুলো আসলে জিনগতভাবে ‘ট্রিপ্লয়েড’ বা তিন সেট ক্রোমোজোম বিশিষ্ট উদ্ভিদ। এই তিন সেট ক্রোমোজোমের ভারসাম্যহীনতার কারণে ফুল থেকে ফল তৈরির সময় স্বাভাবিক পরাগায়ন বা নিষেক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কলার ভেতরের ডিম্বকগুলো পূর্ণাঙ্গ বীজে রূপ নেওয়ার আগেই মাঝপথে মারা যায় এবং ফলের ভেতরে ছোট কালো বিন্দু হিসেবে রয়ে যায়।

বীজ ছাড়াই যেভাবে টিকে আছে কলার সাম্রাজ্য!
যেহেতু আধুনিক কলার বীজ সম্পূর্ণ বন্ধ্যা এবং মৃত, তাই চাষিরা এই গাছগুলোর বংশবৃদ্ধির জন্য বীজের ওপর বিন্দুমাত্র নির্ভর করেন না। একটি পূর্ণাঙ্গ কলাগাছের গোড়ার মাটি একটু খুঁড়লেই দেখা যায়, মাটির তলা থেকে ছোট ছোট তরতাজা নতুন চারা বা কুঁড়ি বের হচ্ছে। চলতি বাংলায় এই চারাগুলোকে ‘তেউড়’ বা ‘পোয়ো’ বলা হয় এবং ইংরেজিতে এদের নাম ‘সাকার’ (Sucker)।

[মাতৃ উদ্ভিদ] ➔ [মাটির নিচে তেউড়/সাকার] ➔ [হুবহু ক্লোন চারা] ➔ [একই স্বাদের মিষ্টি কলা]
চাষিরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল গাছের গোড়া থেকে এই সাকার বা তেউড় কেটে নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন চাষের জমিতে সারিবদ্ধভাবে পুঁতে দেন। এই প্রতিটি চারা আসলে তার মাতৃগাছের একদম হুবহু কার্বন কপি বা প্রাকৃতিক ক্লোন, যার ফলে নতুন গাছেও একই স্বাদের সুমিষ্ট কলা ফলে। বর্তমান যুগে ল্যাবরেটরিতে ‘টিস্যু কালচার’ প্রযুক্তির সাহায্যেও একটিমাত্র গাছের কোষ থেকে লাখ লাখ বীজহীন কলার চারা বাণিজ্যিক স্তরে তৈরি করা হচ্ছে।

সুতরাং চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সত্য এটাই যে, কলার বীজ মানুষের অ্যাপেন্ডিক্সের মতোই ফলের ভেতরে কেবল এক নিষ্ক্রিয় অতীত স্মৃতি হিসেবে অবস্থান করছে। প্রকৃতির বুনো কলার বীজ থেকে নতুন গাছ হলেও, আমাদের চেনা প্রতিদিনের কলার বংশগতির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে শুধুই তার মাটির নিচের তেউড় বা চারা কুঁড়ির মাঝে। বীজ ছাড়াই অত্যন্ত সুকৌশলে মানুষের তৈরি এক চমৎকার ক্লোনিং পদ্ধতির হাত ধরে আজ বিশ্বজুড়ে কলার সাম্রাজ্য রাজত্ব করে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *