এক মিটারে ৮৩ বাড়ি! খোদ শহরের বুকে রমরমিয়ে চলছিল জাল ‘বিদ্যুৎ অফিস’, পর্দা ফাঁস হতেই চোখ ছানাবড়া!

একটা বা দুটো নয়, স্রেফ একটা বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বা মিটার। আর তা থেকেই তার টেনে দেদার আলো-পাখা জ্বলছিল এলাকার ৮৩টি বাড়িতে! মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের খিজরাবাদ কলোনিতে হানা দিয়ে এমনই এক নজিরবিহীন ও বিশাল অবৈধ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের সন্ধান পেলেন বিদ্যুৎ দপ্তরের আধিকারিকরা।
তদন্তে নেমে চোখ কপালে উঠেছে বিদ্যুৎ কোম্পানির কর্তাদের। জানা গেছে, সরকারের চোখ এড়িয়ে ওই এলাকায় রীতিমতো সমান্তরাল এক ‘অবৈধ জোন অফিস’ খুলে বসেছিল দুই প্রতারক। এলাকার নিরীহ বাসিন্দাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের নামে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ও করত তারা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কোটি টাকার জালিয়াতির পর্দা ফাঁস হতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে এলাকায়।
অবৈধ বসতিকে হাতিয়ার করে প্রতারণার ছক
সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, ইন্দোরের খিজরাবাদ কলোনিটি মূলত একটি বেআইনি বা অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বসতি। নিয়ম মেনে বিদ্যুৎ কোম্পানি সেখানে এখনো কোনো স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়নি। আর সাধারণ মানুষের এই অসহায়তার সুযোগটাই নিয়েছিল স্থানীয় কিছু অসাধু চক্র। তারা কলোনির একটি বৈধ বড় সংযোগ থেকে হুকিং করে গোটা এলাকা জুড়ে তারের জাল বিছিয়ে দেয়। এরপর প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে শুরু করে। কার বাড়িতে কটা লাইট বা পাখা চলে— তার ওপর ভিত্তি করে একেক জনের কাছ থেকে একেক রকম মাসিক বিল ঠিক করা হতো।
১ মিটারে অস্বাভাবিক রিডিং, সন্দেহ হতেই খেল খতম
কিন্তু পাপ তো আর চাপা থাকে না! এই বিপুল জালিয়াতি সামনে এল স্রেফ একটি মিটারের অস্বাভাবিক রিডিংয়ের জেরে। বিদ্যুৎ কোম্পানির সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ডিকে গাঠে লক্ষ্য করেন, একটি নির্দিষ্ট মিটারে প্রয়োজনের চেয়ে বহুগুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে এবং তার লোড অস্বাভাবিক রকমের বেশি।
একটি মাত্র মিটারে কেন এত লোড, তা খতিয়ে দেখতেই জোন অফিস থেকে একটি ঝটিকা তদন্ত দল পাঠানো হয় খিজরাবাদ কলোনিতে। সেখানে গিয়ে আধিকারিকরা দেখেন, চারদিকে বিপজ্জনকভাবে তার ঝুলিয়ে মোট ৮৩টি পরিবারকে ওই একটি মিটার থেকে কানেকশন দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দারা ভাবতেন তাঁরা নিয়ম মেনেই আসল বিল দিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে আসল মিটারের যৎসামান্য বিল মিটিয়ে বাকি লাখ লাখ টাকা নিজেদের পকেটে পুরত ওই চক্রের পাণ্ডারা।
যেকোনো সময় ঘটতে পারত বড় বিপর্যয়
তদন্তকারী দলের সদস্যরা জানান, পুরো কলোনিতে যেভাবে কাঁচা ও অস্থায়ী তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল, তাতে তীব্র গরমের মাঝে যেকোনো মুহূর্তে শর্ট সার্কিট হয়ে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বড়সড় প্রাণহানির দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্মীরা কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ ওই সমস্ত অবৈধ সংযোগ কেটে দেন এবং পুরো জালিয়াতির নেটওয়ার্কটি গুঁড়িয়ে দেন।
কাঠগড়ায় রিয়াজ ও দীপক, কড়া আইনি ব্যবস্থার প্রস্তুতি
সহকারী প্রকৌশলী রাজেশ গুপ্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই পুরো চক্রটির নেপথ্যে রয়েছে রিয়াজ খান ও দীপক নামে দুজন ব্যক্তি। তারা দুজনে মিলেই এই অবৈধ নেটওয়ার্কটি চালাচ্ছিল এবং প্রতি মাসে গরিব বাসিন্দাদের ভয় দেখিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে টাকা তুলছিল। বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এই দুজনের বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর (FIR) দায়ের করে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, মে মাসের এই তীব্র দাবদাহ ও তাপপ্রবাহের কারণে বর্তমানে শহর ও গ্রাম— উভয় এলাকাতেই বিদ্যুতের চাহিদা রকেটের গতিতে বাড়ছে। বিদ্যুৎ কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭৫ লক্ষ ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ চুরি বা এমন অবৈধ লোড গ্রিড ও পাওয়ার সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকেও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ দপ্তর সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে এই ধরণের বিদ্যুৎ চোর ও অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান আরও কয়েক গুণ জোরদার করা হবে।