এক ধাক্কায় ৩ টাকা দাম বাড়ল পেট্রোল-ডিজেলের! পকেট খালি আমজনতার, তবু কেন কাঁপছে মোদী সরকার ও তেল কোম্পানিগুলো?

সাধারণ মানুষের পকেটে ফের একবার বড়সড় কোপ বসাল জ্বালানির দাম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক ধাক্কায় লিটার প্রতি ৩ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হলো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। ২০২২ সালের পর এই প্রথম ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল বিপণন সংস্থাগুলো (OMCs) জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে অবাক করার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে লিটারে ৩ টাকা দাম বাড়লেও, খোদ তেল কোম্পানিগুলোই কিন্তু শান্তিতে নেই। বাজারে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। মূল্যবৃদ্ধির এই বড় ঘোষণার পরেও শুক্রবার শেয়ার বাজারে হুড়মুড়িয়ে ধস নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর শেয়ারে। যা দেখে কপালে ঘাম জমছে বড় বড় বিনিয়োগকারীদের।
দাম বাড়ল, তবু কেন ধস নামল শেয়ার বাজারে?
শুক্রবার জ্বালানির দাম বাড়ার খবর চড়াও হতেই শেয়ার বাজারে হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম (HPCL) এবং ভারত পেট্রোলিয়াম (BPCL)-এর শেয়ারের দর প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গেছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীরা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছেন যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে রকেটের গতিতে বাড়ছে, সেই তুলনায় এই ৩ টাকা বৃদ্ধি স্রেফ সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা জলের সমান। দ্রুত বাড়তে থাকা বিশাল লোকসান পুষিয়ে নিতে এই সামান্য দাম বৃদ্ধি কোনো কাজেই আসবে না।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। তার ওপর ইরান-মার্কিন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণই নেই। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মার খাচ্ছে প্রতিদিন।
দৈনিক ৫ বিলিয়ন রুপির মহাক্ষতি!
বিখ্যাত রেটিং এজেন্সি ‘আইসিআরএ’ (ICRA)-র একটি রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ১০৫ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, তবে ভারতের তেল কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন প্রায় ৫ বিলিয়ন রুপি (৫০০ কোটি টাকা) লোকসান গুণতে হতে পারে! এই বিপুল লোকসানের মধ্যে গাড়ির জ্বালানি এবং গার্হস্থ্য এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার— উভয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আজকের এই মূল্যবৃদ্ধির পর রাজধানী দিল্লিতে এখন পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে লিটার প্রতি ৯৭.৭৭ রুপি এবং ডিজেলের দাম হয়েছে লিটার প্রতি ৯০.৬৭ রুপি। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট বলছেন, এই দাম বৃদ্ধি বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
লিটারে আরও ১০ টাকা দাম বাড়ার আশঙ্কা!
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের গণনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের যে বর্তমান দর, তাতে আমাদের তেল কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার পেট্রোল-ডিজেলে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ টাকা করে লোকসান করছে। এর সোজা অর্থ হলো, স্রেফ একটা ত্রৈমাসিকেই কোম্পানিগুলোর মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫৭,০০০ কোটি থেকে ৫৮,০০০ কোটি টাকা!
এই আকাশছোঁয়া লোকসানের গর্ত ভরাট করতে গেলে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে অন্তত আরও ১০ টাকা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই সরকারের কাছে। এই দাম একবারে না বাড়ালেও, আগামী ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে ধাপে ধাপে বাড়ানো হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর তেমনটা হলে সাধারণ মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের বাজেট যে পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
ইরান যুদ্ধের জের: মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে আগুন লাগার ইঙ্গিত
গত ফেব্রুয়ারি মাসেও যেখানে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ছিল মাত্র ৬৯ ডলার, ইরান যুদ্ধের আবহে তা একসময় ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। বর্তমানে তা ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০৭ ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের এই মরণপণ লড়াইয়ের জেরে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ জানে না।
বাজার বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু গাড়ি বা বাইকের ট্যাংঙ্কি ভরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি মহার্ঘ হলে লরি ও পরিবহণ খরচ একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে। আর পরিবহণ খরচ বাড়লে চাল, ডাল, আনাজপাতি থেকে শুরু করে সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম রকেটের গতিতে বাড়বে, যা দেশে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ডেকে আনবে।