সামান্য জ্বালাপোড়া ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন? অজান্তেই বিকল হতে পারে কিডনি! চিনে নিন এই সাইলেন্ট কিলারকে

রোজকার ইঁদুরদৌড়ের জীবনে প্রস্রাবের বেগ চেপে রাখা বা কম জল খাওয়ার অভ্যাস কমবেশি আমাদের অনেকেরই আছে। আর এর হাত ধরেই নিঃশব্দে শরীরে থাবা বসায় মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ‘ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’ (UTI)। অনেকেই একে অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা মনে করে প্রথম দিকে হালকাভাবে নেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করালে এটি আপনার অজান্তেই একটি গুরুতর রূপ নিতে পারে, যার শেষ পরিণতি হতে পারে কিডনি বিকল বা ড্যামেজ হওয়া।

আসুন জেনে নেওয়া যাক ঠিক কী কারণে এই সংক্রমণ হয়, কখন এটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।

নেপথ্যে কোন অদৃশ্য শত্রু?
মেডিক্যাল সায়েন্স বলছে, এই সংক্রমণের জন্য মূলত দায়ী ‘ই. কোলাই’ (E. coli) নামক এক ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। যখন এই ব্যাকটেরিয়া কোনোভাবে মূত্রনালীতে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করে, তখনই ইনফেকশন ছড়ায়।

সংক্রমণের প্রধান কারণগুলো হলো:

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বা হাইজিনের অভাব।

সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল না খাওয়া।

অপরিষ্কার বা নোংরা শৌচাগার ব্যবহার করা।

অনেকের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলেও এই সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে।

সংক্রমণ কখন প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে?
যতক্ষণ এই ইনফেকশনটি কেবল মূত্রথলির (Bladder) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ এটি খুব একটা গুরুতর রূপ নেয় না। কিন্তু সমস্যা তখনই জটিল হয়, যখন এই সংক্রমণ ক্রমশ উপরের দিকে উঠে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন এই ইনফেকশন অবহেলা করলে কিডনি স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে।

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝবেন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে:

কাঁপুনি দিয়ে তীব্র জ্বর আসা।

বমি বমি ভাব বা অনবরত বমি হওয়া।

প্রস্রাবের সঙ্গে হালকা রক্তের আভাস পাওয়া।
এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে ইউরোলজিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সাধারণ কিছু লক্ষণ যা দেখে সতর্ক হবেন
ইউরিন ইনফেকশন হলে শরীর আগে থেকেই কিছু সংকেত দিতে শুরু করে। যেমন:

ডিসইউরিয়া: প্রস্রাব করার সময় তীব্র জ্বালাপোড়া বা ব্যথা হওয়া।

ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, কিন্তু বাথরুমে গেলে প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কম হওয়া।

প্রস্রাব থেকে অতিরিক্ত তীব্র বা কটু গন্ধ বের হওয়া।

তলপেটে বা কোমরের পেছনের দিকে একটানা ব্যথা থাকা।

কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
ইউরিন ইনফেকশন যে কারও হতে পারলেও, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি থাকে বহুগুণ বেশি। বিশেষ করে:

মহিলা ও গর্ভবতী মায়েরা: শারীরিক গঠনের কারণে নারীদের এই ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি।

ডায়াবেটিস রোগী: রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ছড়ায়।

বয়স্ক মানুষ এবং যাঁদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) অত্যন্ত দুর্বল।

বাঁচার উপায়: এই ৫টি নিয়ম মেনে চলুন
সামান্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলেই এই যন্ত্রণাদায়ক রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব:

১. জলের কোনো বিকল্প নেই: সারাদিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার জল পান করুন। জল শরীর থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে ধুয়ে বের করে দেয়।
২. বেগ চেপে রাখবেন না: রাস্তাঘাটে বা কাজের চাপে দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখার অভ্যাস আজই ত্যাগ করুন।
৩. শৌচাগারে পরিচ্ছন্নতা: সর্বদা পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার করুন এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে বাড়তি নজর দিন।
৪. অ্যান্টিবায়োটিকে ‘না’: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে কিনে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করুন। এতে শরীরে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয় এবং ইনফেকশন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
৫. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: আপনি যদি ডায়াবেটিক হন, তবে নিয়মিত সুগার লেভেল পরীক্ষা করুন এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।