যুদ্ধের বাজারে মোদীর এক ডাকে কাঁপছে দেশ! সাইকেলে মন্ত্রী, পায়ে হেঁটে অফিসে মুখ্যমন্ত্রীরা; দেশজুড়ে তুমুল হইচই!

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের মেঘ। ক্রমাগত অশান্ত ও জটিল হয়ে উঠছে বিশ্ব পরিস্থিতি। আর এই আন্তর্জাতিক সংকটের আঁচ যাতে ভারতের অর্থনীতিতে না পড়ে, তার জন্য আগাম এক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দেশবাসীকে পেট্রোল ও ডিজেল সাশ্রয় করার পাশাপাশি জ্বালানি সংরক্ষণকে একটি গণ-আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সেই একটি মাত্র আবেদনই যেন এখন দেশজুড়ে ম্যাজিকের মতো কাজ করতে শুরু করেছে।

উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্র, গুজরাট বা বিহার— একের পর এক রাজ্যে জ্বালানি বাঁচাতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নেওয়া হচ্ছে নজিরবিহীন সব সিদ্ধান্ত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী, উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রীরা তাঁদের বিলাসবহুল গাড়িবহর ছেড়ে কেউ সাইকেলে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ স্রেফ পায়ে হেঁটে অফিসে যাতায়াত করছেন!

ডেইলিয়ান্টের পাঠকদের জন্য রইল দেশের কোন রাজ্যে ঠিক কী পরিস্থিতি, তার একটি এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট:

উত্তরপ্রদেশ: সপ্তাহে ২ দিন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’, যোগীর বড় নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষার আহ্বানে সাড়া দিয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রাজ্যে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা জারি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিজের এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের সরকারি যানবাহনের সংখ্যা একঝটকায় ৫০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মন্ত্রী, সাংসদ এবং বিধায়কদের সপ্তাহে অন্তত একদিন সাধারণ মানুষের মতো গণপরিবহন ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চমক মিলেছে যোগী আদিত্যনাথের টুইটে। তিনি রাজ্যে ‘ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম’ (WFH) সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার জোরদার সুপারিশ করেছেন। যে সমস্ত সংস্থায় প্রচুর কর্মী কাজ করেন, সেখানে সপ্তাহে দুই দিন বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা করার নির্দেশিকা জারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজ্য সচিবালয়ের অন্তত অর্ধেক বৈঠক এখন থেকে সশরীরে না করে ভার্চুয়ালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দিল্লি: শুরু হলো ‘আমার ভারত, আমার অবদান’ মিশন
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কোমর বেঁধে নেমেছে দিল্লির রেখা গুপ্তা সরকারও। রাজধানীতে পেট্রোল ও ডিজেল বাঁচাতে শুরু হয়েছে ‘আমার ভারত, আমার অবদান’ (মেরা ভারত মেরা যোজনা) নামক একটি ৯০ দিনব্যাপী মেগা জনসচেতনতামূলক অভিযান।

দিল্লি সরকারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এখন থেকে সপ্তাহে দুই দিন বাড়ি থেকে কাজ করবেন। মুখ্যমন্ত্রী রাজধানীর সাধারণ মানুষকেও সপ্তাহে অন্তত একদিন ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এর প্রভাবও দেখা গেছে হাতেনাতে। দিল্লির মন্ত্রী প্রবেশ ভার্মা নিজের গাড়ি ছেড়ে সাইকেলে চেপে এনডিএমসি-র বৈঠকে যোগ দিতে যান। দিল্লির সমস্ত বিজেপি বিধায়ক এবং সরকারি দপ্তর এখন থেকে কারপুলিং এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টকে অগ্রাধিকার দেবে বলে জানানো হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান: কনভয় ছোট করলেন মুখ্যমন্ত্রীরা, বন্ধ হলো র‍্যালি
মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মোহন যাদব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থই তাঁদের কাছে সবার আগে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তার খাতিরে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে যানবাহনের সংখ্যা সর্বনিম্ন রাখা হচ্ছে এবং তাঁর কোনো সফরে আর কোনো রকম ‘যানবাহন র‍্যালি’ বা শো-অফ করা হবে না।

একই পথ অনুসরণ করেছে রাজস্থানও। মুখ্যমন্ত্রী ভজন লাল শর্মা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, কনভয়ে অপ্রয়োজনীয় গাড়ি একচুলও বরদাস্ত করা হবে না। মুখ্য সচিব থেকে শুরু করে সমস্ত জনপ্রতিনিধিদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মহারাষ্ট্র ও গুজরাট: বিমানে রাশ, ট্রেনে চড়বেন রাজ্যপাল! বাতিল মার্কিন সফর
পশ্চিম ভারতের দুই শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্যেও জ্বালানি সাশ্রয়ের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। মহারাষ্ট্রের রাজস্ব মন্ত্রী চন্দ্রশেখর বাওয়ানকুলে জানিয়েছেন, এখন থেকে অত্যন্ত জরুরি অবস্থা ছাড়া মন্ত্রীরা দাপ্তরিক কাজে বিমান ব্যবহার করতে পারবেন না। তার আগে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। খোদ ফড়নবীশও গতকাল বুলেটের গতিতে বাইক চালিয়ে অফিসে এসে সবাইকে চমকে দিয়েছেন।

অন্যদিকে, গুজরাটের রাজ্যপাল আচার্য দেবব্রত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, রাজ্যের ভেতরে যাতায়াতের জন্য তিনি আর ভিভিআইপি হেলিকপ্টার বা বিমান ছোঁবেন না; সাধারণ মানুষের মতো ট্রেন বা এসটি বাসে যাতায়াত করবেন। এদিকে, গুজরাটের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি দেশের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ রুখতে নিজের পূর্বনির্ধারিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরটিই বাতিল করে দিয়েছেন।

বিহার: হেঁটে অফিসে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী
প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দেওয়ার তালিকায় পিছিয়ে নেই বিহারও। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী নিজেই দৃষ্টান্ত তৈরি করতে তাঁর বাড়ি থেকে হেঁটে দপ্তরে রওনা হন। উপ-মুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী নিজের গাড়ির সংখ্যা অর্ধেক করে দিয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যাঁরা এই সংকটের সময়েও প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী আহ্বানের বিরোধিতা করছেন, তাঁরা আসলে জাতীয় স্বার্থের আসল মর্মটাই বোঝেন না।”

বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে যখন চরম অনিশ্চয়তা, তখন ভারতের এই অভাবনীয় সাশ্রয় নীতি এবং সাধারণ জীবনযাত্রা বিশ্বমঞ্চে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। আমলা থেকে মন্ত্রী— বিলাসিতা ছেড়ে সবাই এখন শামিল ‘দেশ বাঁচানোর’ এই মহৎ যজ্ঞে।