“আমরা হারলে ১৫০-২০০ লাশ গুনতে হতো!” ভোটের হিংসা নিয়ে শোভনদেবকে নজিরবিহীন আক্রমণ বিজেপি নেতার

২০২৬ সালের ঐতিহাসিক পালাবদলের পর রাজ্যের নতুন বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই চরম রাজনৈতিক উত্তাপ। তীব্র বাদানুবাদ, কটাক্ষ আর বিস্ফোরক অভিযোগে সরগরম হয়ে উঠল দেশের অন্যতম প্রাচীন এই পবিত্র হাউস। একদিকে যখন রাজ্যের নতুন স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হলেন রথীন্দ্র বসু, ঠিক তখনই বিরোধী বেঞ্চকে নিশানা করে চাঁছাছোলা ভাষায় আক্রমণ শানালেন শাসক দলের প্রবীণ নেতা তাপস রায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে স্রেফ ভোট নয়, বরং ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিলেন তিনি।

এদিন নতুন স্পিকার রথীন্দ্র বসুকে স্বাগত জানান বিদায়ী স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি বিরোধী দলের বিধায়করাও নতুন স্পিকারকে ফুল ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করে নেন।

“মারামারি নয়, গঠনমূলক বিরোধিতা চাই”: বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
স্পিকার নির্বাচনের পর বিধানসভায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রাজ্যে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হতে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি সদনে সবসময় গঠনমূলক বিরোধিতা চাই। বিধানসভা কখনও মারামারি বা সংঘর্ষের জায়গা হতে পারে না। এখানে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিতর্ক হবে।” একই সাথে বিরোধী সদস্যদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এবার থেকে বিধানসভার ভেতরে বিরোধীদের আরও বেশি করে কথা বলার এবং জনস্বার্থবাহী ইস্যু তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হবে।

“দেখো দেখো, এবার কি দেখতে খারাপ লাগছে!”
মুখ্যমন্ত্রীর এই শান্ত ও সংযত বার্তার পরই সদনে বলতে ওঠেন বিজেপির প্রবীণ নেতা তাপস রায়। আর বক্তব্য শুরু করতেই তিনি বিরোধী আসনে বসা তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের দিকে তাকিয়ে তীব্র কটাক্ষ ছুড়ে দেন। তাপস বাবু বলেন, “দেখো দেখো, অনেক তো করেছ, এবার কি দেখতে খারাপ লাগছে না কি!” তাঁর এই চিলতে হাসির খোঁচায় মুহূর্তের মধ্যে তেতে ওঠে বিরোধীদের বেঞ্চ।

২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল এক ‘ধর্মযুদ্ধ’
নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে তাপস রায় তাঁর মূল বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার মহোদয়, দেশের প্রাচীনতম এই পবিত্র হাউসের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাই।” এর পরপরই ২০২৬ সালের হাইভোল্টেজ নির্বাচনকে ‘ধর্মযুদ্ধ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই নির্বাচন কোনও সাধারণ নির্বাচন ছিল না। শুধুমাত্র সরকার গঠন বা বিধায়ক হয়ে আসার লড়াই ছিল না এটা। এটা ছিল আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে এক পবিত্র ধর্মযুদ্ধ। আর এই ধর্মযুদ্ধে অধর্মকে হারিয়ে যাঁরা জিতে এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আমি অভিনন্দন জানাই।”

“আইন করে দেশবিরোধী স্লোগান বন্ধ হোক”
বিধানসভার পবিত্রতা বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করে তাপস রায় দাবি তোলেন, হাউসের ভিতরে কোনো রকম দেশবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান বরদাস্ত করা উচিত নয়। প্রয়োজনে আইন এনে এই ধরনের স্লোগান দেওয়া চিরতরে বন্ধ করার দাবি জানান তিনি। আক্রমণাত্মক সুরে তিনি বলেন, “এই ভোটের ফলের পর পশ্চিমবঙ্গ আজ পাপমুক্ত হয়েছে, শাপমুক্ত হয়েছে এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষ ভয়মুক্ত হয়েছে।”

ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে তৃণমূলকে তীব্র নিশানা
সদনে উপস্থিত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাপস রায় অতীতে বিজেপির ওপর হওয়া অত্যাচারের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে ভোটের সময় বিজেপি প্রার্থীদের হাড়গোড় ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আজ ভোট-পরবর্তী হিংসা বা পোস্ট পোল ভায়োলেন্সের কথা এদের মুখে শোভা পায়! নির্লজ্জ, বেহায়া না হলে এই হিংসার কথা এরা বলতে পারে না!”

এখানেই থামেননি তিনি। তৃণমূল যদি এবার ফের ক্ষমতায় ফিরত তবে রাজ্যে রক্তের বন্যা বয়ে যেত বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাপস রায়। তিনি দাবি করেন, “আজ আমাদের অন্তত ১৫০ থেকে ২০০টি বিজেপি কর্মীর লাশ গুনতে হতো, যদি এরা আবার কোনোভাবে রাইটার্স বা নবান্নে ফিরে আসত। হাজার হাজার কর্মীকে ঘরছাড়া হতে হতো।”

“প্রমাণ থাকলে জেলে পাঠিয়ে দিন”
বক্তব্যের শেষে নিজের সততা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বিজেপি নেতা বলেন, “আজ বিরোধী বন্ধুদের বলে যাচ্ছি, আমার নাম যদি কোনোদিন কোনো রকম পোস্ট পোল ভায়োলেন্সে জড়িয়ে থাকে, তবে প্রমাণ দেখিয়ে আমাকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেবেন।” তাপস রায়ের এই খোলামেলা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

সবশেষে স্পিকারকে কুর্ণিশ জানিয়ে এবং সদনে সমবেত সুরে “জয় শ্রীরাম” ও “ভারতমাতার জয়” ধ্বনি দিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করেন তাপস রায়। সব মিলিয়ে, নতুন স্পিকারের কার্যকালের প্রথম দিনেই বুঝিয়ে দিল, আগামী দিনে এই বিধানসভার অধিবেশন কক্ষ কতটা তপ্ত হতে চলেছে।