কানাডাকে ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর হুমকি ট্রাম্পের! সার্বভৌমত্ব বাঁচাতে ৩০ বছরের বৃহত্তম যুদ্ধের প্রস্তুতি জাস্টিন ট্রুডো উত্তরসূরিদের

কয়েক বছর আগেও যে দেশের সামরিক বাহিনী কর্মী সংকটে ধুঁকছিল, খোদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী যাঁদের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন— সেই কানাডা এখন বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে। গত তিন দশকের ইতিহাসে বৃহত্তম নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে ওটাওয়া। যুদ্ধের দামামা আর সার্বভৌমত্বের সংকটে দেশটিতে এখন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার হিড়িক পড়েছে।

ট্রাম্পের ‘হুমকি’ ও জাতীয়তাবাদের উত্থান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত মন্তব্য বড় ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অভিহিত করার পর দেশটির নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞ শার্লট ডুভাল-লান্তুয়ান মনে করেন, এই মন্তব্য কানাডীয়দের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও জাতীয়তাবাদ উসকে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামরিক নিয়োগের তালিকায়।

বেকারত্ব বনাম সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ
কানাডায় বর্তমানে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১৪ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার সামরিক কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি এবং চাকরির নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশাল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল দেশপ্রেম নয়, একটি সুরক্ষিত এবং উচ্চ বেতনভুক্ত পেশা হিসেবেও এখন অনেকে সেনাজীবনকে বেছে নিচ্ছেন।

ন্যাটোর লক্ষ্যমাত্রা ও প্রতিরক্ষা বাজেট
বিশ্বজুড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার আবহে কানাডা তার প্রতিরক্ষা বাজেট আকাশচুম্বী করেছে। ১৯৮০ সালের পর এই প্রথম কানাডা ন্যাটোর নির্দেশিত জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে। বর্তমানে প্রতিরক্ষা খাতে বাৎসরিক খরচ ৬৩ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে এই ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

বিদেশিদের জন্যও অবারিত দ্বার
নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সব নথি অনলাইনভিত্তিক করেছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক হলো— ২০২২ সাল থেকে স্থায়ী বাসিন্দা (Permanent Residents) এবং বিদেশি নাগরিকদের জন্য সেনাবাহিনীর দরজা খুলে দেওয়া। গত এক বছরে নতুন নিয়োগ পাওয়া সৈন্যদের ২০ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। গত অর্থবছর নাগাদ আবেদনকারীর সংখ্যা ২১,৭০০ থেকে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০,১১৬-তে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ এখন ইউনিফর্ম পরার অপেক্ষায়।

আর্কটিক অঞ্চলে নজর
সরকার কেবল সৈন্যই বাড়াচ্ছে না, নতুন অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনা এবং পুরোনো সামরিক ঘাঁটিগুলোর আধুনিকায়নেও জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডা এখন ৮৫,৫০০ নিয়মিত সৈন্য এবং ৩ লক্ষ সংরক্ষিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। যদিও আমেরিকা বা ফ্রান্সের সমকক্ষ হতে কানাডার আরও অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে বলে মনে করছেন সমরবিদরা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই উত্তপ্ত আবহে কানাডার এই বিশাল সামরিক প্রস্তুতি কি কেবলই নিরাপত্তার খাতিরে, নাকি আগাম কোনো বিশ্বযুদ্ধের অশনিসংকেত? নজর রাখছে বিশ্ব।