শুভেন্দুর পিএ-র নৃশংস হত্যা! পনেরো বছরের ‘রক্তাক্ত’ ঐতিহ্য কি ২০২৬-এও ফিরছে? গুরুদেবের শান্ত বাংলা আজ কোথায়?

আড়াই থেকে তিন দশকের রাজনৈতিক বিবর্তন, একাধিকবার ক্ষমতার পালাবদল—কিন্তু বাংলার ললাটে ‘রক্তাক্ত’ কলঙ্ক যেন কিছুতেই মুছে যাচ্ছে না। ১৯৭৭ থেকে ২০১১, দীর্ঘ সিপিএম জমানা থেকে মমতার পনেরো বছরের শাসন, আর এবার ২০২৬-এর মেগা পরিবর্তন; বাংলার মানচিত্র থেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুন কি আদৌ নিভল? গতকাল উত্তর ২৪ পরগনায় ভবানীপুরের বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিব চন্দ্রনাথ রথের নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলার সেই পুরনো ক্ষতের ওপর আবারও লবণের ছিটে দিল।
রক্তাক্ত বাংলার ইতিহাস: বদল নাকি কেবল নামান্তর?
বাংলার রাজনীতি বরাবরই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের চেয়ে পেশ পেশিশক্তির আস্ফালনে বেশি সরব। জ্যোতি বসুর আমল থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, তারপর পরিবর্তনের হাত ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বদলেছে বারবার। ২০১১ সালে যে সিপিএম-কে হটিয়ে বাংলায় ‘শান্তি ও গণতন্ত্র’ ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তৃণমূল জমানাতেও সেই একই প্রতিহিংসার পুনরাবৃত্তি দেখেছে রাজ্যবাসী। ২০২৬-এ বিজেপি ক্ষমতায় এলেও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা যেন কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। আজ ভয়ের পরিধিটা শুধু ঘুরে গিয়েছে—আগের সরকারের যারা ভয়ের কারিগর ছিল, আজ তারাই নতুন সরকারের দাপটে আতঙ্কিত। অর্থাৎ, ‘ভয়’ নামক দানবটি এখনও বাংলার আনাচে-কানাচে বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে।
শুভেন্দুর সচিব খুন: এক অশনি সংকেত?
চন্দ্রনাথ রথের মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছায়াসঙ্গীর এই নৃশংস পরিণতি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলার সংস্কৃতি আজ চরম হুমকির মুখে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই ‘ভয়মুক্ত চিত্ত’ আর ‘উন্নত শির’ আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। ব্রিটিশ নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে কলম গর্জে উঠেছিল, আজ সেই বাংলাতেই রাজনৈতিক দলগুলোর নগ্ন হিংসার খেলা চলছে।
মনীষীদের আদর্শ বনাম বর্তমানের রণক্ষেত্র:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ বা সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মণীষীরা যে বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। গুরুদেব চেয়েছিলেন এমন এক ভারত, যেখানে জগৎ ‘সংকীর্ণ ঘরোয়া প্রাচীরে’ বিভক্ত হবে না। কিন্তু আজকের বাংলা রাজনৈতিক রঙে এমনভাবে বিভক্ত যে, মানুষের প্রাণের চেয়ে ক্ষমতার দাম অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয়তাবাদ নিয়ে ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট—তিনি কোনো উগ্রতা বা যান্ত্রিক প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন সামাজিক ঐক্যে।
অন্যদিকে, স্বামী বিবেকানন্দও বারবার ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক হিংসাকে সভ্যতার ধ্বংসকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, প্রেমের রূপই হলো প্রকৃত অহিংসা। কিন্তু আজকের বাংলার এই হাড়হিম করা পরিস্থিতি কি সেই মণীষীদের বার্তার পরিপন্থী নয়?
উপসংহার:
পশ্চিমবঙ্গ আজ যে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথের বাণী কেবল পুঁথিগত শিক্ষা হয়ে রয়ে গিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে দিল, শাসকের গদি উল্টে গেলেও বাংলার রাজনীতির ‘রক্তলোলুপ’ চরিত্রটি আজও অমলিন। বাংলার মানুষ কি আদৌ সেই ‘স্বাধীনতার স্বর্গে’ জাগবে, যেখানে সত্যের গভীর থেকে কথা উচ্চারিত হয়? নাকি প্রতিহিংসার আগুনেই ছাই হবে আগামীর বাংলা? উত্তরটা সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে।