মাঝ সমুদ্রে যমদূত ‘হান্টাইরাস’! রহস্যময় অসুখে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, আতঙ্কে কাঁপছে বিলাসবহুল ক্রুজ শিপ

আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির বুকে ভেসে চলা একটি বিলাসবহুল ক্রুজ শিপে এখন শুধুই কান্নার রোল আর আতঙ্ক। ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ (MV Hondius) নামক ওই জাহাজে হানা দিয়েছে বিরল এবং মারণাত্মক ‘হান্টাইরাস’ (Hantavirus)। রহস্যময় এই ভাইরাসের থাবায় ইতিমধ্যেই তিন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন এক ব্রিটিশ নাগরিক। বর্তমানে ১৪৯ জন যাত্রী নিয়ে জাহাজটি আফ্রিকার কেপ ভার্দে উপকূলের কাছে অবস্থান করলেও, সংক্রমণের ভয়ে কোনো দেশই সেটিকে ভিড়তে দিচ্ছে না।

মৃতের তালিকায় কারা?
জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা জানিয়েছে, মৃতদের মধ্যে রয়েছেন এক ডাচ দম্পতি এবং একজন জার্মান নাগরিক। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৬৯ বছর বয়সী অসুস্থ ব্রিটিশ নাগরিক এবং মৃত ডাচ মহিলার শরীরে হান্টাইরাসের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে বাকিদের মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখছে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।

তৎপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এই জাহাজে থাকা আরও পাঁচজনের শরীরে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাঁদের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। হান্টাইরাস মূলত ইঁদুর বা এই জাতীয় প্রাণীর মল, মূত্র বা লালার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি মানুষের শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। তবে আশার কথা হলো, এই ভাইরাস একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার হার অত্যন্ত কম।

ঘটনার ক্রমপঞ্জি: যেভাবে শুরু হলো বিপর্যয়

১১ এপ্রিল: জাহাজের প্রথম এক পর্যটকের শরীর খারাপ হয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।

২৪ এপ্রিল: জাহাজটি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে পৌঁছালে সেখানে মৃতদেহ নামানো হয়। প্রথম মৃতের স্ত্রীও সেখানে নেমে যান, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর রহস্যজনকভাবে তাঁরও মৃত্যু হয়।

২৭ এপ্রিল: এক ব্রিটিশ পর্যটক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বর্তমানে আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন।

শনিবার: জাহাজে থাকা আরও এক জার্মান পর্যটকের আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা জাহাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

জলবন্দি ১৪৯ জন যাত্রী
জাহাজে ২৩টি দেশের মোট ১৪৯ জন যাত্রী সওয়ার রয়েছেন। আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে নিরাপত্তার খাতিরে কাউকে উপকূলে নামার অনুমতি দেয়নি। বর্তমানে জাহাজটিকে স্পেনের লাস পালমাস বা তেনেরিফে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, যেখানে উন্নত মানের চিকিৎসা পরিকাঠামোয় সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে।

চিকিৎসা ও সতর্কতা
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যারন মোৎসোলেডি জানিয়েছেন, হান্টাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। রোগীর উপসর্গ দেখে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা করা হয়। অন্যদিকে, হু-এর ইউরোপীয় ডিরেক্টর হান্স হেনরি পি ক্লুগে জানিয়েছেন, এই রোগ অত্যন্ত বিরল, তাই সাধারণ মানুষের ঘাবড়ানোর প্রয়োজন নেই।

বর্তমানে জাহাজের দুজন ক্রু মেম্বারের শরীরেও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁদের বিশেষ মেডিকেল বিমানে করে সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় চলছে। মাঝ সমুদ্রে থাকা এই ‘ভাসমান হাসপাতাল’ এখন কবে ডঙ-এ ফেরার অনুমতি পায়, সেদিকেই তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।