“জামাইষষ্ঠীতে কী ভাবে মুখ দেখাব”-শশুরবাড়ি যাওয়া নিয়ে চিন্তায় চাকরিহারা শিক্ষক

স্কুল শিক্ষক হিসেবে পাড়ার যে কোনও অনুষ্ঠানে তাঁকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হতো। গ্রামের পুজো-পার্বণ থেকে শুরু করে যে কোনও অনুষ্ঠানে দেখা যেত সামনের সারিতে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে এসএসসি মামলার রায় বেরনোর পর তাঁর জীবনে এসেছে বড়সড় পরিবর্তন। শনিবার সকাল থেকে পাড়ায় হরিনাম সংকীর্তন শুরু হলেও, মঙ্গলপুর গ্রামের মেধাবী যুবক দিবাকর মণ্ডল সেই আসর থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। চোখের জল ফেলতে ফেলতে পুরনো বই-খাতার ধুলো ঝাড়ছেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যে ২৬ হাজার স্কুল শিক্ষকের চাকরি গিয়েছে, তাঁদেরই একজন এই দিবাকর। চাকরি হারানোর বেদনায় তাঁর মন আজ বিষণ্ণ। বইয়ের ধুলো ঝাড়ার ফাঁকে তিনি বললেন, “অনেক লড়াই, সংগ্রাম করে শিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলাম। এক ঝটকায় সব শেষ হয়ে গেল।” তবে অন্য চাকরিহারাদের মতো এখনই ভেঙে পড়তে নারাজ তিনি। দৃঢ় কণ্ঠে জানালেন, “হাল ছাড়ছি না। আবার লড়াই করব। লড়াইয়ের ময়দানে থাকব। তাই নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেছি।”

মঙ্গলপুর দুর্গা মন্দিরের কাছে আমবাগানের মধ্যে দিবাকরের বাড়ি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান তিনি। বাবা তরণী মণ্ডল এলাকার মানুষের কাছে বিড়ি শ্রমিক হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর আগেও টালির ছাউনি দেওয়া একটি ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন দিবাকররা। মহাজনের কাছে বিড়ি বেঁধে বাবা যে সামান্য টাকা উপার্জন করতেন, তা দিয়েই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে দিবাকর সব শখ-আহ্লাদ ছেড়ে রাতদিন পড়াশোনায় মগ্ন থাকতেন। ২০০৯ সালে ভাঙড় কলেজে ইতিহাসে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। এরপর আধুনিক ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং বিএড সম্পন্ন করেন। একসময় গেস্ট লেকচারার হিসেবে ভাঙড় কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন তিনি।

২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বসেন দিবাকর। পরের বছর নেট ও সেট পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়ার পর উত্তর ২৪ পরগণার বাছড়া এমসিএইচ হাই স্কুলে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনিই ছিলেন স্কুলের একমাত্র ইতিহাসের শিক্ষক। দিবাকরের সঙ্গে আরও ৯ জন শিক্ষক ওই স্কুলে যোগদান করেছিলেন। বিদ্যাধরী নদী পেরিয়ে নৌকায় চেপে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হতো শিক্ষকদের। দুর্গম এলাকা হওয়ায় বাকি ৮ জন শিক্ষক উৎসশ্রীর মাধ্যমে অন্যত্র বদলি হয়ে গেলেও ছাত্রদের ভালোবাসার টানে স্কুল ছাড়তে পারেননি দিবাকর। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আজ তিনি সেই স্কুল ছাড়তে বাধ্য হলেন।

দিবাকর জানান, চাকরি পাওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁদের নিজস্ব ভিটেমাটি বলতে কিছুই ছিল না। চাকরি পাওয়ার পর দুটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে জমি কেনেন এবং সেখানে একটি বাড়ি তৈরি করেন। এর মধ্যেই তাঁর বাবা-মা কঠিন রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁদের চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়। সেই কারণে আবারও বাজার থেকে ঋণ নিতে হয়েছে দিবাকরকে। গত ডিসেম্বরে তাঁর বিয়ে হয়েছে। স্কুল শিক্ষক দেখে মেয়ের বাড়ির লোকজন সানন্দে বিয়ে দিয়েছিলেন। দিবাকরের চাকরি যাওয়ায় তাঁরাও ভেঙে পড়েছেন। জামাইষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়িতে কী ভাবে মুখ দেখাবেন, সেই ভাবনাও এখন তাঁর মাথায় ঘুরছে। তিনি বলেন, “বাড়ির সবাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছি। আদালত বলেছে, তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা হবে। তাই এক দিনও সময় নষ্ট না করে নতুন করে আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছি।”

ছেলের চাকরি চলে যাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন দিবাকরের মা ভবানী মণ্ডল। তিনি বলেন, “আমার ছেলে লোকের কাছ থেকে জামা, বই, খাতা নিয়ে পড়াশোনা করেছে। ওর বাবা মুখে রক্ত তুলে ওকে মানুষ করেছে। আজ যোগ্য-অযোগ্যের বিচার হবে না? সবার চাকরি যাবে? এ কেমন বিচার?”

দিবাকরের প্রতিবেশী সুদীপ মণ্ডল বলেন, “এসএসসির প্রথম প্যানেলে দিবাকরের নাম ছিল। ১৩০ র‍্যাঙ্ক করেছিল। বাজারে লক্ষ লক্ষ টাকা ঋণ আছে। কী করে চলবে ওদের?” বাছড়া এমসিএইচ হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উৎপল বর্মন বলেন, “আমাদের স্কুলে মোট ২৫ জন স্থায়ী শিক্ষক ছিলেন। এক ধাক্কায় ৯ জনের চাকরি চলে গিয়েছে। এখন যে ক’জন আছেন, তাঁদেরকে দিয়ে স্কুল চালানো কঠিন। আমরা এখন বিচার ব্যবস্থা আর সরকারের দিকে তাকিয়ে।”