“গাঁজা খেয়ে বেসামাল পাইলট!”-জেনেনিন কেন গঞ্জিকা–সেবনের এই প্রবণতা বাড়ছে?

‘কী ব্যাপার! গাঁজা খেয়ে বিমান ওড়াচ্ছেন নাকি!’—ভবিষ্যতে ফ্লাইটে সামান্য ঝাঁকুনি হলেও যাত্রীদের মনে হয়তো এই প্রশ্নই জাগবে। সম্প্রতি ৪ অগস্টের ফুকেট-দিল্লি এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে ঘটা ঘটনা তেমনই এক আতঙ্কজনক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। ওডিশার আকাশে আচমকাই ৩০০ ফুট নিচে নেমে আসা বিমানটিতে আহত হয়েছিলেন অন্তত ১৭ জন যাত্রী। তদন্তে নেমে যা সামনে এসেছে, তা শোনার পর যে কোনো সাধারণ মানুষেরই পিলে চমকে যাবে—বিমানের মুখ্য পাইলট মদ্যপ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন গাঁজার নেশায় বেসামাল!
ককপিটে পাইলটের ভয়ঙ্কর কাণ্ড
সূত্রের খবর, টেক-অফের কিছুক্ষণ পরেই নেশার ঘোরে ককপিটের মেঝেতে বসে পড়েন ওই পাইলট। এমনকি কো-পাইলটের সিটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় তাঁর হাত লেগে বিমানের তিনবার হাইড্রলিক ফেলিওর হয় বলে ধারণা করছেন সিনিয়র পাইলটরা। বিমান যখন হু হু করে নিচে নামছিল, তখন নেশাগ্রস্ত পাইলট নিজেও মেঝেতে ছিটকে পড়েন। বিমানের অটো-পাইলট সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাইড্রলিক ফেলিওর এবং কেবিনের এয়ার-প্রেশার নষ্ট হওয়ার মতো একের পর এক অ্যালার্ম বাজতে থাকে ককপিটে। মাত্র দু-তিন মিনিটের ব্যবধানে প্রায় ১১টি অ্যালার্ম বেজে উঠেছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যাত্রীরা সেদিন মৃত্যুর কতটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।
আত্মপক্ষ সমর্থন ও ধামাচাপার চেষ্টা
ঘটনার পর মেডিক্যাল টেস্টে পাইলটের শরীরে নেশার প্রমাণ মিললেও তিনি গাঁজা খাওয়ার কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। তাঁর দাবি, আগের কয়েকদিনের কাজের চাপের কারণে তিনি ভালো করে ঘুমাতে পারেননি, তাই কিছু ওষুধ খেয়েছিলেন। যদিও ডিজিসিএ (DGCA)-র নিয়মানুসারে, এই ধরনের আচরণ যে কতটা গুরুতর অপরাধ, তা বলাই বাহুল্য। অবসরপ্রাপ্ত পাইলট সুমন্ত রায়চৌধুরীর প্রশ্ন, “নিরাপত্তার খাতিরে বিমানটি ভুবনেশ্বর বা কলকাতায় ডাইভার্ট না করে আহত যাত্রীদের নিয়ে কেন দিল্লি পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো? সম্ভবত নেশাগ্রস্ত থাকায় পাইলট সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।”
কেন ধরা পড়ছে না এই মরণ নেশা?
পাইলটদের একটা বড় অংশের মতে, মদ খেলে ব্রেদালাইজ়ার (BA) টেস্টে ধরা পড়ার ভয় থাকে। কিন্তু গাঁজা বা কোকেনের মতো মাদক শনাক্ত করার জন্য ফ্লাইটের আগে রক্ত বা প্রস্রাব পরীক্ষা করার মতো কোনো প্রযুক্তি এখনও এয়ারলাইনগুলোর কাছে নেই। ২০২১ সালে ডিজিসিএ পাইলটদের গাঁজা ও কোকেন-সহ ৬টি ড্রাগ নিয়ে সতর্ক করলেও, পরীক্ষার কোনো ডিভাইস না থাকায় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই ঘটনার পর অভিযুক্ত পাইলটকে রিহ্যাবে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো কি পাইলটদের নেশার চিকিৎসার চেয়ে ব্যবসার দিকেই বেশি মন দিচ্ছে? আর যে খ্যাতি বা যাত্রী নিরাপত্তার বিশাল ক্ষতি হলো, তার দায়ভার কে নেবে? আকাশের সীমানায় বসে যখন চালকের আসনটাই নেশায় টলমল করে, তখন যাত্রীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে? এই ঘটনা এভিয়েশন জগতের নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিয়ে গেল।