হঠাৎ ফোনের কভারের পেছনে তেজপাতা রাখছেন কেন সবাই? কোন অন্ধবিশ্বাসে মেতেছে নেটপাড়া?

সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে কান পাতলেই প্রতিদিন নতুন নতুন হ্যাক বা ট্রেন্ডের খোঁজ মেলে। আর ইদানীং ইন্টারনেটে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে, তা হলো স্মার্টফোনের ব্যাক কভারের পেছনে একটি শুকনো তেজপাতা লুকিয়ে রাখার আজব প্রবণতা। অনেকেই জোরালো দাবি করছেন যে, ফোনের সঙ্গে তেজপাতা রাখলে নাকি জীবনে হু হু করে অর্থ, সাফল্য ও সমৃদ্ধি আসে। কেউ কেউ আবার এটিকে নেতিবাচক শক্তি বা কুনজর থেকে বাঁচার অব্যর্থ কবজ হিসেবেও দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রান্নার মসলা কীভাবে রাতারাতি ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি হয়ে উঠল? এর পেছনে কি আদৌ কোনো যুক্তি আছে, নাকি পুরোটাই কুসংস্কার?
প্রাচীন বিশ্বাস ও আধুনিক জমানার ট্রেন্ড
তেজপাতা আমাদের দেশের রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত একটি মসলা। তবে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতিতে তেজপাতাকে জ্ঞান, সম্মান, বিজয় ও সাফল্যের প্রতীক বলে মনে করা হতো। এমনকি প্রাচীনকালে বিজয়ীদের মাথায় তেজপাতার মুকুট পরানোর চলও ছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চর্চায় সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির টোটকা হিসেবে মানিব্যাগে বা সিন্দুকের মধ্যে তেজপাতা রাখার প্রচলন শুরু হয়।
আর বর্তমান যুগে স্মার্টফোন মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ থেকে শুরু করে অনলাইন ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন—সবকিছুই এখন মুঠোফোনে বন্দি। প্রাচীন সেই বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক জীবনের এই নির্ভরশীলতাকে জুড়ে দিয়েই একাংশ মানুষ এখন ফোনের ব্যাক কভারের ভেতর তেজপাতা গুঁজে দিচ্ছেন।
সত্যিই কি অর্থ বা সৌভাগ্য আসে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ফোনের কভারে একটি শুকনো পাতা গুঁজে রাখলে কি সত্যিই ব্যাংক ব্যালেন্স বা সৌভাগ্য বেড়ে যায়?
এর সোজা উত্তর হলো—না। এই দাবির সপক্ষে বিন্দুমাত্র কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তেজপাতা একটি সুগন্ধি মসলা এবং এর রন্ধনসম্পর্কীয় নানা ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু এটিকে ফোনের কভারে রাখলে কোনো জাদুকরি ‘পজিটিভ এনার্জি’ তৈরি হবে বা তা অলৌকিকভাবে অর্থ আকর্ষণ করবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য কোথাও নেই।
‘নেতিবাচক শক্তি’ দূর করার ধারণাও অমূলক
ভাইরাল এই ট্রেন্ডকে ঘিরে আরও একটি প্রচলিত দাবি হলো, ফোনের মধ্যে তেজপাতা রাখলে নাকি মোবাইল থেকে নির্গত হওয়া বা ফোনের মাধ্যমে আসা কোনো অদৃশ্য ‘নেতিবাচক শক্তি’ ও কুনজর থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অনেকে এটিকে ‘গুড লাক চার্ম’ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, এই ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই। স্মার্টফোনের কল, ইন্টারনেট বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত কার্যক্রম থেকে তেজপাতা কোনো নেতিবাচক শক্তি শুষে নেয়—এমন কোনো প্রমাণ আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানসম্মত গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
আপনার কি এই ট্রেন্ড অনুসরণ করা উচিত?
কেউ যদি নিছক ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা শখের বশে শুকনো তেজপাতা ফোনের কভারে রাখতেই পারেন, তবে সেটিকে একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখা উচিত। কিন্তু এর মাধ্যমে রাতারাতি অর্থনৈতিক উন্নতি বা সাফল্য নিশ্চিত হয়ে যাবে—এমন আকাশকুসুম প্রত্যাশা করা একেবারেই বোকামি।
বরং এর ফলে একটি বাস্তব সমস্যা হতে পারে। পকেটে বা ব্যাগে ফোন রাখার সময় শুকনো তেজপাতা ভেঙে তার ছোট ছোট টুকরো কভারের ভেতরে জমতে পারে। এর ফলে ধুলোবালি জমে ফোনের পেছনের অংশে ঘর্ষণ বা স্ক্র্যাচ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিশেষে বলা যায়, জীবনের আর্থিক উন্নতি বা কেরিয়ারের সাফল্য কোনো তেজপাতা বা অন্ধবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং বাস্তবসম্মত আর্থিক সিদ্ধান্ত। ভাইরাল ট্রেন্ডের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানোই শ্রেয়।