“শুধু যোগ্যদের চাকরি ফিরিয়ে দিন”-পরীক্ষা না দিয়েই নতুন করে নিয়োগ চান ‘যোগ্য’ কর্মহীনরা

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে এক ধাক্কায় ২৫,৭৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি হারানোর পর গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁদের। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বহুজনই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে আগামীকাল, সোমবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কর্মহীন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে দেখা করতে চলেছেন। সূত্রের খবর, সেই সভায় কর্মহীন ‘যোগ্য’ প্রার্থীদের অনেকেই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তাঁদের হারানো চাকরি ফেরত চাইবেন।
আন্দোলনকারীদের একাংশের স্পষ্ট বক্তব্য, চাকরি ফেরতের জন্য তাঁরা নতুন করে আর কোনও পরীক্ষায় বসতে রাজি নন। যদি মুখ্যমন্ত্রী সেই ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে নেতাজি ইন্ডোরের সভা থেকেই রাজ্য সরকার বিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিতে পারেন তথাকথিত ‘যোগ্য’ চাকরিহারারা। তাঁদের অনেকেরই মত, দীর্ঘ সময় পর লক্ষ লক্ষ পুরোনো ও নতুন প্রার্থীর সঙ্গে চাকরির পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাঁদের পক্ষে কঠিন। তাঁদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো প্রকল্প চালু করে গোটা দেশকে পথ দেখাচ্ছেন। তাহলে ‘যোগ্য’ চাকরিহারাদের জন্যও তিনি নতুন দিশা দেখান।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কর্মহীন শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল বলেন, “আমরা দলবদ্ধভাবেই মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যাচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি, আদালতের নির্দেশে যে চাকরি গিয়েছে, সেই চাকরি যেন আমাদের বজায় থাকে। তবে তার জন্য আমরা নতুন করে আর কোনও পরীক্ষায় বসতে রাজি নই। এমনকি আইনি পদ্ধতি মেনেই সেই চাকরি বহাল করতে হবে মুখ্যমন্ত্রীকে। কারণ আমরা জানি, উনি নিজের দায়িত্বে আমাদের চাকরি দিতে পারবেন না।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, “আমরা যদি চাকরি ফিরে না পাই, তাহলে নেতাজি ইন্ডোর থেকেই সোমবার রাজ্যজুড়ে নতুন আন্দোলনের ডাক দেব।” কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার শুক্রবারই বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নম্বর বরাদ্দ করা উচিত, যাতে অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় তাঁদের নিয়োগ সহজ হয়। সদ্য চাকরিহারা শিক্ষিকা পায়েল মিশ্র বলেন, “আমরা অনেক আশা নিয়েই সোমবার যাব। আমরা চাই, রাজ্য সরকার আইনি পথে আমাদের পাশে দাঁড়াক। তবে একান্তই যদি পরীক্ষা দিতে হয়, তাহলে আমাদের এতদিনের চাকরির জন্য বিশেষ ওয়েটেজ অবশ্যই দেওয়া হোক।” আরেক কর্মহীন শিক্ষিকা অমৃতা ঘোষের কথায়, “এতদিন পর অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা সত্যিই কঠিন। স্কুলের চাকরি পেয়ে আমরা শুধু ক্লাসেই পড়াতাম। যারা এখনও চাকরি পায়নি, তারা তো নিয়মিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়। এখন মুখ্যমন্ত্রীই ঠিক করুন, তিনি কীভাবে আমাদের মতো ১৯ হাজারের বেশি যোগ্য প্রার্থীকে নিশ্চয়তা দিতে পারেন।”
আজ, রবিবার সন্ধ্যায় শহিদ মিনারে চাকরিহারা শিক্ষকদের সংগঠন ‘যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’ একটি সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সেখান থেকে তাঁরা তাঁদের ভবিষ্যৎ রণকৌশল এবং অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে পারেন। এমনকি, রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলিকেও সেখান থেকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হতে পারে। উল্লেখ্য, দেশের শীর্ষ আদালত কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ২০১৬ সালের এসএসসির পুরো নিয়োগ প্যানেল বাতিল করেছে।
এই ‘যোগ্য’ চাকরিহারারা যে সংগঠন তৈরি করেছেন, তাঁদের আহ্বানে সোমবার নেতাজি ইন্ডোরের সভায় যাবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বৃহস্পতিবারই বলেছিলেন, “ওঁরা বঞ্চিত শিক্ষক অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছেন। শিক্ষামন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন, আমি যাতে তাঁদের কাছে যাই। কথা শুনতে তো কোনও দোষ নেই। আমি ওদের কথা শুনতে যাব।” তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না চাকরিহারারা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, “মুখ্যমন্ত্রী যা করার করুন, শুধু যোগ্য প্রার্থীদের চাকরি ফিরিয়ে দিন।” সোমবারের নেতাজি ইন্ডোরের সভা এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।