‘লক্ষ লক্ষ স্থায়ী পদ খালি রেখে ঠিকা নিয়োগ কেন?’ মমতা জমানার নীতি নিয়ে প্রশ্ন, নবান্নের নতুন নির্দেশে কাঁপছে রাজ্য!

বিগত প্রায় দেড় দশকে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সরকারি দফতরে হওয়া অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা এবার কঠোরভাবে খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু করল নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অতীতে কোন দফতরে কতজন চুক্তিভিত্তিক কর্মী বহাল হয়েছিলেন এবং সেই নিয়োগে যথাযথ সরকারি বিধি মানা হয়েছিল কি না, তা এবার বিশদে পরীক্ষা করা হবে।
রাজ্যের এই নজিরবিহীন প্রশাসনিক রদবদল ও কড়া নজরদারির খবরে ইতিমধ্যেই চরম শোরগোল ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মচারীদের অলিন্দে।
৬ নভেম্বরের মধ্যে জমা দিতে হবে নথি: তৎপরতা শুরু সেচ দফতরে
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, মূলত ‘গ্রুপ ডি’ পদের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের যাবতীয় তথ্য অবিলম্বে রাজ্য সরকারের দফতরে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
কড়া নির্দেশিকা: ইতিমধ্যেই সেচ ও জলসম্পদ দফতর তৎপরতা শুরু করে রাজ্যের সমস্ত সার্কেলের সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে নির্দিষ্ট বয়ানে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
-
যেসব নথি পরীক্ষা করা হবে: অর্থ দফতরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বা সঠিক নিয়মানুযায়ী নিয়োগ হয়েছিল কি না, এবং কর্মরত কারও বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে কি না—যাবতীয় তথ্য প্রয়োজনীয় নথিসহ আগামী ৬ নভেম্বরের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
তৃণমূল জমানা থেকে বর্তমান: ৫ লক্ষে পৌঁছাল চুক্তিভিত্তিক কর্মী
প্রশাসনের অন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে ২০১২ সালে একলপ্তেই দমকল দফতরে ১ হাজার ৬৯২ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালে পুলিশি সহায়তার জন্য অনুমোদন মেলে ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিভিক পুলিশের।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রাম পুলিশ ও গ্রিন পুলিশের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লক্ষ ১৫ হাজারের বেশি। পাশাপাশি ২০২৪-এর রাজ্য বাজেট অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ সি ও ডি কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যে সর্বমোট চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৫ লক্ষে।
‘স্থায়ী পদ খালি রেখে ঠিকা নিয়োগ কেন?’ ক্ষোভ কন্ট্রাকচুয়াল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এই বিশাল বহর নিয়ে পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের নীতিকে কড়া ভাষায় বিঁধেছেন অল ইন্ডিয়া কন্ট্রাকচুয়াল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মনোজ চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, “লক্ষ লক্ষ স্থায়ী পদ খালি থাকা সত্ত্বেও চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ানো হয়েছে। এতে রাজস্বের ওপর যেমন বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তেমনই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন রয়েছে।”
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
-
অবসরকালীন সুবিধার অভাব: বাম ও তৃণমূল—দুই জমানা থেকেই গ্রুপ সি ও ডি-তে অসংখ্য শূন্যপদ খালি থাকা সত্ত্বেও যোগ্যদের স্থায়ী না করে ঠিকাচুক্তিতে নিয়োগ করা হয়েছে, যাঁদের কোনো পেনশন বা অবসরকালীন সুবিধা নেই।
-
স্থায়ীকরণের আর্জি: অস্থায়ী কর্মীদের মধ্যে যাঁদের সঠিক যোগ্যতা ও দক্ষতা রয়েছে, বর্তমান সরকার তাঁদের স্থায়ীভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করুক।
-
হয়রানি বন্ধের দাবি: নবান্নের এই বর্তমান নথি যাচাই প্রক্রিয়াকে ঘিরে কর্মরত অস্থায়ী কর্মীরা যাতে মাঝপথে কোনো প্রশাসনিক হেনস্থা বা হয়রানির মুখে না পড়েন, সে বিষয়েও প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, বিগত জমানার এই বিপুল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফাইল খোলার পর জল কোন দিকে গড়ায় এবং তদন্তে কী অনিয়ম সামনে আসে, সে দিকেই এখন নজর সবার।