ছাঁটাইয়ের কোপে ১০ বছরের সাম্রাজ্য! নেটफ्लিক্সের প্রধানকে তাড়ানো কি শুধুই সাজানো নাটক?

ওটিটি দুনিয়ার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারিণী এবং গ্লোবাল এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে পরিচিত নেটफ्लিক্সের অন্দরে এই মুহূর্তে চলছে এক চরম অভূতপূর্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। কোম্পানির শেয়ারের দামে লাগাতার দরপতন, নতুন গ্রাহক বা দর্শক টানার ক্ষেত্রে আশঙ্কাজনক ধীরগতি এবং একসাথে প্রায় ১,০০০ কর্মীকে হঠাৎ চাকরি থেকে ছাঁটাই করার নির্মম সিদ্ধান্তের মাঝেই সামনে এল এক চূড়ান্ত চাঞ্চল্যকর খবর। প্রায় এক দশক ধরে নিরলস পরিশ্রম করে নেটफ्लিক্সের কনটেন্ট সাম্রাজ্যকে বিশ্ববাসীর ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেওয়া এবং কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা চিফ কনটেন্ট অফিসার বেला বাজারিয়াকে রাতারাতি অত্যন্ত অপমানজনকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংস্থার এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের পর থেকেই বিশ্ব এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় অংশের বিশেষজ্ঞ এবং শীর্ষ আধিকারিকদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কোম্পানির বর্তমান ব্যবসায়িক মন্দা এবং কাঙ্ক্ষিত গ্রোথ রেট ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার সমস্ত দায় কি তবে একা বেলার কাঁধে চাপিয়ে তাঁকে স্রেফ ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হলো?
ভারতীয় বংশোদ্ভূত অত্যন্ত প্রভাবশালী মিডিয়া এক্সিকিউটিভ বেলা বাজারিয়া ২০১৬ সালে নেটफ्लিক্স পরিবারে যোগদান করেছিলেন। এর আগে তিনি সিবিএস (CBS) এবং এনবিসি ইউনিভার্সালের মতো প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি ইউনিভার্সাল টেলিভিশনের প্রধান হিসেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে নেটफ्लিক্সের গ্লোবাল চিফ কনটেন্ট অফিসার পদে উন্নীত করা হয়। তাঁর ওপর বিশ্বজুড়ে কোম্পানির সমস্ত অরিজিনাল সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এবং টেলিভিশন শোয়ের সামগ্রিক কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের পূর্ণ দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় প্রথাগত ইংরেজি ভাষার প্রোগ্রামিংয়ের গণ্ডি থেকে বের করে নেটफ्लিক্সকে একটি সত্যিকারের বিশ্বজনীন ও বহুভাষিক গ্লোবাল বিজনেস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার নেপথ্যে বেলার অবদান ছিল ঐতিহাসিক। তাঁর কার্যকালেই কোম্পানিটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দুই ডজন আন্তর্জাতিক অফিস খুলেছিল এবং স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষার মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির পেছনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল।
শুধু তাই নয়, ঐতিহ্যবাহী ওডিটি প্রথার বাইরে গিয়ে নেটफ्लিক্সকে সরাসরি লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ও খেলাধুলার দুনিয়ায় প্রবেশ করানোর মূল কৃতিত্বও একলা বেলারই প্রাপ্য। জনপ্রিয় স্পোর্টস ব্র্যান্ড ডব্লিউডব্লিউই (WWE) এবং এনএফএল (NFL)-এর সঙ্গে শত কোটি ডলারের মেগা লাইভ ব্রডকাস্টিং চুক্তি করিয়ে আনতে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, যার ফলে কোম্পানির নতুন বিজ্ঞাপন-সমর্থিত (Ad-supported) সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানে হু হু করে নতুন সাবস্ক্রাইবার বা গ্রাহক সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছিল। বিখ্যাত ট্যালেন্ট এজেন্সি ডব্লিউএমই (WME)-এর কো-চেয়ারম্যান রিচার্ড ওয়েটজ ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বমানের নতুন প্রতিভাদের নেটफ्लিক্সের সঙ্গে যুক্ত করা এবং লাইভ স্পোর্টস, মিউজিক কনসার্ট ও ইভেন্টগুলো সফলভাবে প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বেলার অবদান ছিল চিরস্মরণীয়।
তা সত্ত্বেও কেন এমন প্রভাবশালী ও সফল একজন আধিকারিককে হঠাত্ এত বড় কোণঠাসা হতে হলো? নেটफ्लিক্স করপোরেট বোর্ডের পক্ষ থেকে বেলার এই আকস্মিক বিদায়ের সুনির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বিনোদন পত্রিকা ‘ভ্যারাইটি’-র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ইনভেস্টরদের কাঙ্ক্ষিত গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার তীব্র অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে কোম্পানি, আর সেই ব্যর্থতার পুরো দায়ই একতরফাভাবে কনটেন্ট বিভাগের ওপর চাপানো হচ্ছে। হলিউডের এক শীর্ষস্থানীয় ইন্ডাস্ট্রি ইনসাইডার ও গোপন সূত্রের মতে, বেলাকে অত্যন্ত সুকৌশলে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে। ওই সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ ও সমালোচকরা সবসময় ব্যবসার ওঠানামার জন্য সরাসরি অনস্ক্রিন কনটেন্টকে দোষারোপ করলেও, কোনো সংস্থাই কখনো একসাথে ১০০০ কর্মী ছাঁটাই করে না, যদি না তাদের মূল বিজনেস মডেল বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অন্দরে কোনো মারাত্মক ও সুগভীর গলদ থাকে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধবার্ষিকীতে নেটफ्लিক্সের ওভারঅল ইউজার এনগেজমেন্ট বা দর্শক ব্যস্ততা বার্ষিক তুলনার নিরিখে মাত্র ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছুদিন আগেই একটি আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ইভেন্টে কোম্পানির কো-সিইও টেড সারান্ডোস নিজেও এই ব্যবসায়িক শ্লথগতির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। তিনি দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন যে, কোম্পানি যতটা দ্রুত গতিতে প্রসারিত হতে চেয়েছিল, ঠিক সেই গতি বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না এবং এই স্থবিরতা কাটাতে জোরকদমে কাজ চলছে। এর পাশাপাশি চলতি বছরের প্রাইমটাইম এমি অ্যাওয়ার্ডসে নেটफ्लিক্সের শো গুলোর চূড়ান্ত ভরাডুবি এই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০২৫ সালে যেখানে কোম্পানিটি মোট ৩০টি মর্যাদাপূর্ণ এমি পুরস্কার জিতেছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা হুড়মুড়িয়ে কমে মাত্র ১৬টিতে এসে ঠেকেছে। ২০১৬ সালের পর এটিই নেটफ्लিক্সের ইতিহাসে সবথেকে খারাপ পারফরম্যান্স হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ কিংবা ‘ব্রিজারটন’-এর মতো কিছু জনপ্রিয় সিরিজ থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি দীর্ঘকাল ধরে ‘স্ট্রेंजर থিংস’-এর মতো কোনো বিশ্বব্যাপী সর্বগ্রাসী মেগা হিট বা কালজয়ী কাল্ট শো উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।