শেয়ার বাজারে ধস নামতেই কোপ আবাসন বাজারে! এক ধাক্কায় ২০ লক্ষ কোটি টাকা খুইয়ে ঘর কেনার স্বপ্ন কি তবে অধরা?

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতীয় শেয়ার বাজারের লাগাতার অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। দালাল স্ট্রিটে টানা আট সপ্তাহ ধরে শেয়ার বিক্রি ২৫ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FII) ক্রমাগত শেয়ার তুলে নেওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় ২০ লক্ষ কোটি টাকা হারিয়েছেন। ২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত সেনসেক্স এবং নিফটি প্রায় ১৫ শতাংশ পতন দেখেছে। আর শেয়ার বাজারের এই ব্যাপক পতন এবার সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে রিয়েল এস্টেট বাজারেও, যা সাধারণ মানুষের বাড়ি কেনার স্বপ্নে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে।

৯টি প্রধান শহরে কমল বাড়ি বিক্রি
রিয়েল এস্টেট ডেটা অ্যানালিটিক্স সংস্থা ‘প্রপইকুইটি’-র একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (Q3) দেশের শীর্ষ নয়টি শহরে নতুন বাড়ি বিক্রি গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে মোট ১০৩,১৭০টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে।

পূর্ববর্তী ত্রৈমাসিকের (Q2) তুলনায় তৃতীয় ত্রৈমাসিকে বিক্রির পরিমাণ ৪ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি, নতুন প্রকল্প চালুর সংখ্যাতেও উল্লেখযোগ্যভাবে ১৫ শতাংশ হ্রাস দেখা গেছে। যেখানে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ১,১৫,০১০টি নতুন বাড়ি বাজারে এসেছিল, সেখানে তৃতীয় ত্রৈমাসিকে তা কমে দাঁড়ায় ৯৮,১৬৫টিতে। তবে মজার বিষয় হলো, নতুন প্রকল্প কমলেও মোট আবাসন বিক্রি নতুন চালুর সংখ্যাকে প্রায় ৫,০০০ ইউনিট ছাড়িয়ে গেছে। শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন প্রকল্প চালুর ক্ষেত্রে থানেতে ২৮%, চেন্নাইতে ২২%, দিল্লি-এনসিআর-এ ১৯% এবং পুনেতে ১৭% বড় পতন ঘটেছে।

কেন দ্বিধগ্রস্ত ক্রেতারা?
বাজারের এই মন্দার পেছনে শুধু শেয়ার বাজারের অনিশ্চয়তাই নয়, বরং আবাসনের আকাশছোঁয়া দামও একটি অন্যতম প্রধান কারণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পত্তির দাম লাগাতার বাড়ায় ক্রেতারা নিজেদের বাজেট নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পড়েছেন। চেন্নাই ও পুনেতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যেখানে বার্ষিক বিক্রি যথাক্রমে ১৭% এবং ১৬% কমেছে। মুম্বই ও দিল্লি-এনসিআর-এর মতো প্রধান বাজারগুলোতেও একই ছবি ধরা পড়েছে।

কাউন্টি গ্রুপের পরিচালক অমিত মোদীর মতে, একে চাহিদার সম্পূর্ণ অবসান বলা চলে না। পূর্বের ত্রৈমাসিক বেশ শক্তিশালী থাকায় সামান্য এই মন্দা স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত দামের কারণে মানুষ এখন আর তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রতিটি প্রকল্প অত্যন্ত ভেবেচিন্তে যাচাই করছেন।

ব্যতিক্রমী ছবি হায়দ্রাবাদে
দেশের অন্যান্য বড় শহরে মন্দা দেখা গেলেও এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ধরা পড়েছে হায়দ্রাবাদে। সেখানে নতুন প্রকল্প চালুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় একলাফে ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং বাড়ি বিক্রিও বেড়েছে ১১ শতাংশ। এছাড়া নভি মুম্বইতে বিক্রি বাড়লেও বেঙ্গালুরুর বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

হোমল্যান্ড গ্রুপের সিইও উমাং জিন্দালের মতে, হায়দ্রাবাদের এই তথ্য প্রমাণ করে যে চাহিদা সব জায়গায় একরকম নয়। ক্রেতারা এখন দামের সাথে তাল মিলিয়ে প্রজেক্টের মান ও অবস্থান খতিয়ে দেখছেন। ফলে যে প্রকল্পগুলো উন্নত সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, সেগুলোর চাহিদা তুঙ্গে রয়েছে।

উৎসবের মরসুমের দিকে তাকিয়ে রিয়েল এস্টেট সেক্টর
বর্তমানে রিয়েল এস্টেট খাতের সমস্ত আশা ও ভরসা ঝুলছে আসন্ন উৎসবের মরসুমের ওপর। এই উৎসবের মরসুমই নির্ধারণ করবে যে তৃতীয় ত্রৈমাসিকের এই মন্দা নেহাতই একটি সাময়িক বিরতি, নাকি ক্রেতাদের মানসিকতায় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতীয় আবাসন বাজার মূলত শুভ দিন এবং পজিটিভ সেন্টিমেন্টের ওপর নির্ভরশীল। উৎসবের বিশেষ অফার এবং ছুটির মরসুমের কথা মাথায় রেখে বহু পরিবার এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করে। ফলে পুজো ও দিওয়ালির মরসুমে আবাসন বাজারে ফের চাঙ্গা ভাব ফিরে আসবে বলেই জোরালো আশা করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *