৭০ বছর ধরে যে বাড়িতে বাস, স্ট্রেচারে করে ৮৭ বছরের বৃদ্ধাকে উচ্ছেদ! স্পেনে দাবানলের মতো ছড়াল আন্দোলন

মুদ্রাস্ফীতি এবং আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া ইতিমধ্যেই স্পেনের বাসিন্দাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। তবে এর মাঝেই ৮৭ বছর বয়সি এক বৃদ্ধাকে তাঁর দীর্ঘদিনের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার একটি অমানবিক ঘটনা গোটা দেশে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। শুধু ক্ষোভ প্রকাশেই সীমাবদ্ধ না থেকে, স্পেনের সাধারণ মানুষ এখন এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এক বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।

ঠিক কী ঘটেছিল মারিক্যারমেনের সঙ্গে?
মাদ্রিদের বাসিন্দা মারিয়া দেল কারমেন আবাসকাল—যিনি সকলের কাছে ‘মারিক্যারমেন’ নামেই পরিচিত, তিনি প্রায় ৭০ বছর ধরে একই বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে জোরপূর্বক তাঁর বহুদিনের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। পুলিশি পাহারায় স্ট্রেচারে করে এক বৃদ্ধাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে আনার সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য নিমেষেই দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ওই বাড়িটির মালিকানা বদল হওয়ার পরেই নতুন মালিক ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বার্ধক্যজনিত আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই বর্ধিত ভাড়া দেওয়া মারিক্যারমেনের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আর তার জেরেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেপ্টেম্বর মাসে বাড়িছাড়া হতে হয়।

কীভাবে এই ঘটনা রূপ নিল জনরোষে?
স্ট্রেচারে শায়িত মারিক্যারমেনের অসহায় মুখের সেই ছবি স্পেনের ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট এবং সাধারণ ভাড়াটেদের চরম দুর্দশার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানী মাদ্রিদের ঐতিহাসিক পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে প্রায় ১,০০০ বিক্ষোভকারী জমায়েত হয়ে একটানা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। শুধু মাদ্রিদেই নয়, বার্সেলোনা সহ স্পেনের অন্যান্য বড় শহরেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েন। বিক্ষোভকারীদের স্পষ্ট দাবি, সরকার অবিলম্বে ভাড়াটেদের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন না আনলে তাঁরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবেন না।

স্পেনের তীব্র আবাসন সংকটের আসল কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একজন বয়স্ক মহিলাকে উচ্ছেদ করার বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং এটি স্পেনের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর আবাসন সংকটেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। দেশটিতে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়া—উভয়ই এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে স্পেনে গড় বাড়িভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে প্রতি বর্গমিটারের গড় ভাড়া ছিল প্রায় ৮.২০ ইউরো, তা ২০২৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫.১০ ইউরোতে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের প্রায় ২৬ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাঁদের আয়ের গড়ে ৪০ শতাংশই কেবল বাড়িভাড়া ও গৃহস্থালির অন্যান্য খরচ মেটাতে খরচ করতে বাধ্য হন। যার জেরে তরুণ প্রজন্ম এবং স্বল্প আয়ের পরিবারগুলি সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। এর মূল কারণ হল স্পেনে সাশ্রয়ী মূল্যের বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভাড়াবাড়ির মারাত্মক আকাল। উপলব্ধ মোট ভাড়াবাড়ির মধ্যে মাত্র ২%-এরও কম সরকারি মালিকানাধীন, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হার প্রায় ৮ শতাংশ।

অবশেষে স্বস্তি মারিক্যারমেনের
এদিকে দেশজুড়ে চলা তীব্র চাপের মুখে পড়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন মারিক্যারমেন। তাঁর আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড়িওয়ালা কোম্পানির সঙ্গে একটি ইতিবাচক সমঝোতা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তাঁর মাসিক ভাড়া তাঁর আয়ের ৩০ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ ইউরোতে সীমাবদ্ধ রাখা হবে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি ফের তাঁর সেই পুরোনো বাড়িতেই ফিরে যেতে পারবেন।

তবে মারিক্যারমেনের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান হলেও, স্পেনের আকাশছোঁয়া ভাড়া এবং আবাসন সংকটের বেড়াজাল থেকে সাধারণ মানুষ কবে মুক্তি পাবেন—এখন সেটাই সবথেকে বড় প্রশ্ন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *