বাপের বাড়িতে একা আসেন না উমা! দেবী প্রতিমার ঠিক মাথার ওপর লুকিয়ে থাকেন কোন মহাশক্তি? জানলে চমকে যাবেন

কৈলাসে তখন চূড়ান্ত ব্যস্ততা। চার ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে বাপের বাড়ি আসার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন মা উমা। পুরাণ ও লোককথা অনুযায়ী, একা কৈলাসে থাকবেন ভোলেবাবা, তাঁকেই একাই সব সামলাতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বাপের বাড়ি আসার সময় স্বামীকেও সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তো নেই! তাই মণ্ডপে মণ্ডপে সপরিবার দুর্গার আরাধনা হলেও, শিব সেখানে সশরীরে অনুপস্থিত থাকারই কথা। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

মণ্ডপে গিয়ে দেবী প্রতিমার দিকে একটু খুঁটিয়ে দেখলেই কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য এক সত্যি চোখে পড়ে। উমা মোটেও একা আসেন না! তাঁর ঠিক মাথার ওপর, চালচিত্রের একেবারে কেন্দ্রে শান্ত হয়ে বসে থাকেন খোদ মহাদেব। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছে, তাহলে সেখানে জামাইয়ের জায়গা হলো কী করে? এটি কি নেহাতই মণ্ডপ সাজানোর জন্য কোনো শিল্পীর খেয়াল? একেবারেই নয়। এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক সুগভীর পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক রহস্য।

শিব ও শক্তির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
এই পুরো বিষয়টি আসলে শিব আর শক্তির চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের প্রতীক। পুরাণ এবং তন্ত্রশাস্ত্র মতে, শিব আর শক্তি একে অপরের পরিপূরক; তাঁদের কখনো আলাদা করা সম্ভব নয়। শাস্ত্র বলে, শিব হলেন ‘পুরুষ’ অর্থাৎ পরমসত্তা বা চেতনা এবং দুর্গা হলেন ‘প্রকৃতি’ অর্থাৎ মহাশক্তি। পুরুষকে বাদ দিয়ে প্রকৃতি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই প্রকৃতি ছাড়া পুরুষের অস্তিত্বেরও কোনো অর্থ হয় না। তন্ত্রে এমন কথাও বলা হয় যে, শক্তি ছাড়া মহাদেব আসলে প্রাণহীন।

কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যে এলেও স্বামীর জন্য দেবীর মন কেমন করে। স্বামী-স্ত্রীর এই অটুট প্রেম এবং চিরন্তন সম্পর্ককে সম্মান জানাতেই প্রতিমার চালচিত্রে মহাদেবকে স্থান দেওয়া হয়। দেবী দুর্গা মর্ত্যে এলেও, শিব যে সর্বদা তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন— এই গভীর বিশ্বাসটাই প্রতিমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা। স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর যাতে কখনোই বিচ্ছেদ না হয়, সেই কারণেই চালচিত্রে শিবের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

কেন মাথার ওপরে থাকেন মহাদেব?
শিব কেন ঠিক প্রতিমার মাথার ওপরে থাকেন, পাশে কেন স্থান পান না? এর পিছনেও রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক কারণ। মহাদেব হলেন ধীর, স্থির এবং শান্ত। অন্যদিকে দেবী দুর্গা হলেন সক্রিয় শক্তির রূপ। চালচিত্রের ওপরে মহাদেব শান্ত সমাহিত ভঙ্গিতে বিরাজ করেন এবং তিনি হলেন নীরব দর্শক। আর তাঁর ঠিক নীচেই শক্তিরূপিণী দুর্গা অনন্ত মহিমায় অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, শিবের আশীর্বাদ ও উপস্থিতি ছাড়া এই অশুভ শক্তির বিনাশ করা সম্ভব নয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, পুজোর মণ্ডপে চালচিত্রের এই বিশেষ নকশা শুধুই কোনো সাজসজ্জা নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সুগভীর দর্শন এবং অটুট দাম্পত্য প্রেমের বার্তা। দেবী দুর্গা যখন মর্ত্যলোকে পূজিতা হন, তখন চালচিত্রের শিখর থেকে মহাদেব যেন গোটা জগতের ওপর নিজের আশীর্বাদ বর্ষণ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *