এক রাতে ৮২২ ড্রোন ধ্বংস! পুতিনের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে ইউক্রেনের সর্বাত্মক হামলায় ৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

রবিবারে ইউক্রেনের তরফ থেকে চালানো এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের ড্রোন হামলায় কেঁপে উঠল রাশিয়া। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন উড়িয়ে এই আকস্মিক হামলা চালায় ইউক্রেন। এই ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই অন্তত ছয়জন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মস্কোর নিকটবর্তী পোডলস্কে রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও ‘অ্যামাজন’ খ্যাত ওয়াইল্ডবেরিজের (Wildberries) একটি প্রধান গুদামে ড্রোন আছড়ে পড়ায় সেখানে ভয়াবহ আগুন লেগে যায়। মুহূর্তে আকাশ ঢেকে যায় কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলীতে।
রাতভর ৮২২ ড্রোন ধ্বংসের দাবি রাশিয়ার
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (AP) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন যে, রাশিয়ার রাজধানীর দিকে ধেয়ে আসা প্রায় ৬০০টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছিল, যার এক-তৃতীয়াংশই মস্কো অঞ্চলে ধ্বংস করা হয়েছে। আঞ্চলিক গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ নিশ্চিত করেছেন যে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাই মস্কো অঞ্চলে ১৮৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এছাড়া ডোমোডেডোভোর একটি ওষুধের গুদাম এবং ভোসক্রেসেনস্কের একটি শিল্প এলাকাতেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের খবর মিলেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মস্কো অঞ্চলে একটি ব্যক্তিগত বাড়িতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ৮৩ বছর বয়সি এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি, রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলেও ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে কিয়েভ বাহিনী। গভর্নর ইউরি স্লিওসার জানিয়েছেন, দেড়শটিরও বেশি ড্রোন নিয়ে চালানো ওই হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকটি আবাসিক বাড়ি ও একটি রেলস্টেশন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ান লজিস্টিক্সে বড় ধাক্কা
রাশিয়ার পণ্য পরিবহন ও ই-কমার্স পরিকাঠামোর অন্যতম মূল স্তম্ভ এই ওয়াইল্ডবেরিজ গুদামগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনীয় ড্রোন অভিযানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে এপর্যন্ত কোম্পানিটির অন্তত ২০টি গুদামে হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে রবিবারে আক্রান্ত হওয়া কোলেডিনো বিতরণ কেন্দ্রটি মস্কো অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবগুলির একটি।
পালটা রক্তক্ষয়ী হামলা চালাল রাশিয়াও
ইউক্রেনের এই বিশাল ড্রোন হামলার জবাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি রুশ সামরিক বাহিনীও। কিয়েভ, ক্রেমেনচুক এবং ক্রিভি রিহ-র মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো লক্ষ্য করে একযোগে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হানা চালিয়েছে মস্কো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ক্রিভি রিহ-তে রাশিয়ার অত্যন্ত নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সুমি শহরে আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী কিয়েভের অন্তত দুটি বড় জেলায় বিধ্বংসী আগুন লেগে যাওয়ায় ছয়জন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, রুশ বাহিনী ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালায়। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৮৫টি ড্রোন ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হলেও অন্তত ১৩টি স্থানে মারাত্মক আঘাত হেনেছে রুশ মিসাইল।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের এই হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল কিয়েভের একটি প্রধান সামরিক-শিল্প স্থাপনা, ক্রেমেনচুক তেল শোধনাগার এবং ক্রিভি রিহ-র বিখ্যাত আর্সেলরমিটাল খনি ও ধাতুবিদ্যা কমপ্লেক্স। আরবিসি-ইউক্রেনের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় সেখানকার প্রধান জ্বালানি ও ব্লাস্ট ফার্নেস উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
ন্যাটোর আকাশসীমায় উত্তেজনার পারদ
যুদ্ধের আঁচ কেবল রাশিয়া ও ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি মলদোভা থেকে উড়ে রোমানিয়ার আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একটি সন্দেহভাজন ড্রোনকে স্পেনের একটি এফ-১৮ যুদ্ধবিমান আকাশে拦截 করে গুলি করে ভূপাতিত করেছে। দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত বন্দর শহর গালাতির কাছে ঘটা এই ঘটনার পর রোমানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাদু মিরুতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের দেশ নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং মিত্র দেশগুলো সবসময় তাঁদের পাশে রয়েছে।