“দেশে গণতন্ত্র নেই!” মোদি সরকারকে তুলোধনা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর, সংসদের বাইরে কালো পোশাকে তুমুল বিক্ষোভ বিরোধী সাংসদদের

“দেশে গণতন্ত্র নেই! সংসদে পড়ুয়াদের ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে দেওয়া হচ্ছে না। বরং সেখানে যা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।” পড়ুয়াদের নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু বর্তমান সরকারের নীতিতে তা আজ ধ্বংসের মুখে। বুধবার সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকারকে এভাবেই কড়া ভাষায় আক্রমণ শানালেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক তথা ওয়েনাড়ের সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

উল্লেখ্য, গতকাল দেশজুড়ে পরীক্ষার্থীদের উপর পুলিশি অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোক কল্যাণ মার্গের বাসভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসেছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলের হেভিওয়েট সাংসদরা। আন্দোলনরত সেই সমস্ত নেতাদের জবরদস্তি টেনে-হিঁচড়ে বাসে তুলে আটক করে দিল্লি পুলিশ। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন চত্বর কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় এবং গভীর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কালো পোশাকে সংসদে বিরোধীদের নজিরবিহীন প্রতিবাদ
আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর হওয়া এই পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে এদিন কংগ্রেস সহ সমস্ত বিরোধী দলের সাংসদরা কালো পোশাক পরে সরাসরি সংসদে হাজির হন। সকালে সংসদ চত্বরে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস নেতা কেসি বেণুগোপাল থেকে শুরু করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং অন্যান্য বিরোধী সাংসদরা একযোগে ‘নরেন্দ্র মোদি ভীতু’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় তাঁদের হাতে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ড সংক্রান্ত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়। পাশাপাশি, যন্তর মন্তরে নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে এখনও জোরদার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, “গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদের অধিকার। এই বিষয়গুলো কোনোভাবেই অগণতান্ত্রিক হতে পারে না। বরং সংসদ এবং রাস্তাঘাটে যা ঘটছে, সেটাই চরম অগণতান্ত্রিক। সংসদে আমাদের আলোচনা করতে দেওয়া হচ্ছে না। বিরোধী দলনেতা এবং অন্যান্য বিরোধী সাংসদদের মুখ খুলতে বা বলার অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। যখনই তাঁরা কিছু বলতে উঠছেন, তখনই তাঁদের থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক বলেন, “অধ্যক্ষ বলছেন যে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পড়ুয়াদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের মতো গুরুতর বিষয়ে আলোচনা করা যাবে কি না, সেই অনুমতি নিতে তাঁকে সরকারের কাছে জিজ্ঞাসা করতে হবে! এ কী ধরনের ব্যবস্থা? এর অর্থ হলো দেশে গণতন্ত্র পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছে।”

আটকের ঘটনা নিয়ে মুখ খুললেন প্রিয়াঙ্কা
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভের সময় রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব ও অন্যান্যদের আটকের প্রসঙ্গ টেনে প্রিয়াঙ্কা স্পষ্ট জানান, তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কী ঘটেছে, তা এখানে মোটেও প্রাসঙ্গিক নয়। তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন দেশের সাধারণ পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁদের বার্তাটি পৌঁছে দিতে। তাঁর প্রশ্ন, “ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা কি ঠিক না ভুল? তারা সবাই তরুণ সমাজ। তারা প্রতিবাদ করছে এবং সেই প্রতিবাদ কোনো ভুঁইফোড় বিষয় নয়, বরং একটি অত্যন্ত যথার্থ ইস্যুতে তারা রাস্তায় নেমেছে। দেশের প্রতিটি অভিভাবক, প্রতিটি শিক্ষক এবং প্রতিটি পড়ুয়া এই সত্যটা জানেন। ছাত্রছাত্রীরা তো কেবল তাদের মৌলিক অধিকারটুকুই দাবি করছে।”

মোদি সরকারকে সরাসরি নিশানা করে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আরও অভিযোগ করেন যে দেশের যুবসমাজকে নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য অমানসিক পরিশ্রম করতে হয়, অথচ এই সরকারের ভুল নীতির কারণে আজ তাদের সেই ভবিষ্যৎ নিমিষে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের পুরো বাজেট যেখানে মাত্র ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা, সেখানে আপনারা শিল্পপতি আদানি এবং আম্বানিজির ১৬ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ সম্পূর্ণ মকুব করে দিচ্ছেন! অথচ দেশের দরিদ্র কৃষক, সাধারণ মানুষ কিংবা এই পড়ুয়ারা সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্য বা সুরাহা পায় না।”

লোকসভায় অচলাবস্থা ও উত্তাল অধিবেশন
এদিকে, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর লোক কল্যাণ মার্গের বাসভবনের সামনে ধর্নাস্থলে হঠাৎ করেই হাজির হন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সেই আলোচনায় বসার ছবিও সামনে আসে। পরে জিতেন্দ্র সিং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানান যে কংগ্রেসের এই অবস্থান বিক্ষোভ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানাতেই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে পাঠানো হয়েছিল, কারণ এই ধর্নার ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম অসুবিধা হচ্ছিল। একইসঙ্গে এনডিএ সরকারের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয় যে সংসদের বর্তমান বাদল অধিবেশনেই নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এই সংক্রান্ত ছাত্র আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

আজ লোকসভার অধিবেশন শুরু হতেই সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু স্পিকার ওম বিড়লাকে জানান যে সরকার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করতে সম্পূর্ণ রাজি রয়েছে। এর জন্য একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে আলোচনার সুনির্দিষ্ট নিয়ম, তারিখ ও সময়সীমা চূড়ান্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং অধ্যক্ষ কিরেণ রিজিজুকে এ বিষয়ে বিবৃতি দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানিয়ে কংগ্রেস সাংসদ কেসি বেণুগোপাল সাফ জানিয়ে দেন যে শুধু নামমাত্র আলোচনা নয়, তাঁরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও দাবি করছেন।

এরপর রিজিজু ফের জানান যে সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, তবে সব দলকে নিয়ে বৈঠকে বসে কোন নিয়মের আওতায়, কবে এবং কতক্ষণ ধরে এই বিতর্ক চলবে তা ঠিক করতে হবে। এই বক্তব্য সামনে আসতেই বিরোধীরা সরকার-বিরোধী স্লোগানে ফেটে পড়েন। সংসদের নিম্নকক্ষে ব্যাপক হইচই ও হট্টগোল শুরু হওয়ার জেরে দুপুরের অধিবেশন মুলতুবি করে দিতে বাধ্য হন স্পিকার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *