খাবার খেতে খেতে হঠাৎ বিষম লেগেছে? ভুলেও এই ১টি কাজ করবেন না, হতে পারে প্রাণহানি!

দুপুরের লাঞ্চ বা রাতের ডিনারে খেতে খেতে হঠাৎ কোনো মজার কথা মনে পড়ে হেসে ওঠা, কিংবা তাড়াহুড়ো করে খাবার গিলতে গিয়ে হঠাৎ বিষম খাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কম-বেশি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে এবং শুরু হয় তীব্র কাশি। অনেকেই এই অবস্থায় না ভেবেই আক্রান্ত ব্যক্তির মাথার তালুতে আঘাত করেন কিংবা পিঠে জোরে জোরে থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। কেউ কেউ আবার তড়িঘড়ি জল খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই চেনা অভ্যাসগুলো সব সময় নিরাপদ তো নয়ই, বরং চরম বিপজ্জনক! ভুল পদ্ধতিতে সাহায্য করতে গেলে শ্বাসনালিতে আটকে থাকা খাবার আরও ভেতরে চলে যেতে পারে, যা পরিস্থিতিকে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে।
কেন ওঠে এই আকস্মিক বিষম?
আমাদের গলায় পাশাপাশি দুটি নালি থাকে—একটি খাদ্যনালি ও অন্যটি শ্বাসনালি। সাধারণ নিয়মে খাবার গেলার সময় ‘এপিগ্লটিস’ (Epiglottis) নামের একটি ছোট পর্দা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্বাসনালির মুখ বন্ধ করে দেয়, যাতে খাবার সরাসরি খাদ্যনালিতে যায়। কিন্তু খাওয়ার সময় অতিরিক্ত কথা বললে, হাসলে বা দ্রুত গিলে ফেললে এই পর্দাটি ঠিকমতো কাজ করার সময় পায় না। তখনই খাবারের টুকরো বা জলের কণা ভুলবশত শ্বাসনালিতে ঢুকে পড়ে। আর শরীর সেই অবঞ্ছিত বস্তুটি বের করে দেওয়ার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই জোরে কাশি শুরু করে। এটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বিষম’ খাওয়া।
এমন জরুরি পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকরা বিশেষ কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন:
বিষম উঠলে ঠিক কী করবেন?
কাশতে উৎসাহ দিন: আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমেই আতঙ্কিত না করে আরও জোরে কাশতে বলুন। কাশি হলো শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাশির দমকেই আটকে থাকা খাবার বেরিয়ে আসে।
সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন: আক্রান্ত ব্যক্তিকে সোজা দাঁড়িয়ে না রেখে শরীর কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে বলুন। এতে অভিকর্ষের (Gravity) টানে আটকে থাকা খাবার ভেতরে যাওয়ার বদলে কাশির সাথে বাইরে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা বাড়ে।
পিঠে নিয়ন্ত্রিত আঘাত: যদি কাশির পরেও সমস্যা না কমে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, তবে রোগীকে সামনে ঝুঁকিয়ে দুই কাঁধের মাঝখানে আপনার হাতের তালুর গোড়ালি দিয়ে পরপর ৫ বার হালকা অথচ নিয়ন্ত্রিত আঘাত করুন।
ভুলেও যা করবেন না:
বিষম ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জোর করে জল খাওয়াতে যাবেন না। এতে আটকে থাকা খাবার আরও নিচে নেমে শ্বাসনালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। মাথায় আঘাত করা বা মুখে ফুঁ দেওয়া থেকেও বিরত থাকুন। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি একেবারেই শ্বাস না নিতে পারেন, ঠোঁট বা নখ নীলচে হয়ে আসে কিংবা অজ্ঞান হয়ে পড়েন, তবে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
জীবনদায়ী ‘হিমলিচ ম্যানুভার’ (Heimlich Maneuver):
শ্বাসরোধ হওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে শ্বাসনালি পরিষ্কার করার এক জাদুকরী প্রাথমিক চিকিৎসা হলো ‘হিমলিচ ম্যানুভার’। এটি ফুসফুসের নিচে হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করে আটকে থাকা বস্তুকে বাইরে ঠেলে বের করতে সাহায্য করে।
কীভাবে করবেন এটি?
১. আক্রান্ত ব্যক্তির ঠিক পেছনে দাঁড়ান বা বসুন এবং আপনার দুই হাত দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরুন।
২. আপনার এক হাতের বুড়ো আঙুলটি ভেতরের দিকে রেখে শক্ত করে মুঠো তৈরি করুন।
৩. এই মুঠো করা হাতটি আক্রান্ত ব্যক্তির নাভির সামান্য ওপরে এবং বুকের খাঁচার ঠিক নিচে স্থাপন করুন।
৪. এবার অন্য হাত দিয়ে সেই মুঠোটিকে শক্ত করে চেপে ধরুন।
৫. এবার ভেতরের দিকে এবং ওপরের দিকে (Upward and Inward) দ্রুত ও সজোরে ৫ বার চাপ দিন।
৬. যতক্ষণ না আটকে থাকা বস্তুটি মুখ দিয়ে বের হচ্ছে, ততক্ষণ এই প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি করতে থাকুন।
বিশেষ সতর্কতা:
আক্রান্ত ব্যক্তি যদি কথা বলতে, শ্বাস নিতে বা কাঁপতে পারেন, তবে ভুলেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করবেন না; বরং তাকে আরও জোরে কাশতে উৎসাহিত করুন। এছাড়া ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।