আপনার গোপন কথাও কি বেচে দিল চ্যাটজিপিটি? মেটা-গুগলের হাতে আপনার তথ্য! তোলপাড় বিশ্ব

বর্তমান যুগে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা বা অফিসের কাজ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত মানসিক সমস্যা, আইনি জটিলতা কিংবা চিকিৎসার পরামর্শ— অনেকেই এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবটকে ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ বন্ধু ভেবে মনের সব গোপন কথা উজার করে দেন। কিন্তু আপনি যা ভাবছেন, তা কি আদেও সত্যি? চ্যাটজিপিটি কি সত্যিই আপনার তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে দায়ের হওয়া একটি হাইপ্রোফাইল ক্লাস অ্যাকশন মামলা কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য এবং হাড়হিম করা ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওপেনএআই (OpenAI)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা কোটি কোটি চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য এবং তাঁদের করা প্রশ্নগুলো গোপনে টেক জায়ান্ট গুগল (Google) এবং মেটা (Meta)-র সাথে শেয়ার করেছে।

গোপনে বসানো হয়েছিল ‘ডিজিটাল নজরদার’!
মামলার চার্জশিটে অত্যন্ত বিস্ফোরক কিছু দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওপেনএআই তাদের চ্যাটজিপিটি ওয়েবসাইটে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘মেটা পিক্সেল’ (Meta Pixel) এবং ‘গুগল অ্যানালিটিক্স’ (Google Analytics)-এর মতো ট্র্যাকিং টুল বা কোড ইনস্টল করে রেখেছিল।

এই ট্র্যাকারগুলোর কাজ হলো ব্যবহারকারী চ্যাটবক্সে কী লিখছেন, কী সার্চ করছেন, তাঁর ইমেল আইডি কী— এই সমস্ত ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করা। এরপর ব্যবহারকারীর অজান্তেই সেই সমস্ত ব্যক্তিগত ফাইল ও ডেটা চলে যেত ফেসবুকের মাদার কোম্পানি মেটা এবং গুগলের সার্ভারে।

কেন এই তথ্য চুরি মারাত্মক বিপজ্জনক?
সাধারণ মানুষ যখন কোনো সার্চ ইঞ্জিনে কিছু খোঁজেন, তার চেয়ে চ্যাটজিপিটি-র কাছে অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল প্রশ্ন করেন। মানুষ বিশ্বাস করেন যে এখানে তাঁদের কথোপকথন সম্পূর্ণ গোপন থাকবে।

যদি আদালতে এই অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে তার অর্থ দাঁড়াবে— আপনি চ্যাটজিপিটি-কে নিজের যে অসুখের কথা বা আর্থিক সংকটের কথা বলেছিলেন, সেই তথ্যকে হাতিয়ার করে গুগল বা ফেসবুক আপনাকে সেই সংক্রান্ত নানারকম চটকদার বিজ্ঞাপন (Targeted Advertisements) দেখানো শুরু করেছে। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনের বাজার ধরতে আপনার ব্যক্তিগত জীবনের তথ্যকে কার্যত পণ্যে পরিণত করা হয়েছে।

কড়া আইনি মারপ্যাঁচে ওপেনএআই
মামলাকারীদের দাবি, ওপেনএআই এই কাজ করে আমেরিকার অত্যন্ত কড়া আইন ‘カリフォルニア ক্যালিফোর্নিয়া ইনভেশন অফ প্রাইভেসি অ্যাক্ট’ এবং ‘ইলেকট্রনিক কমিউনিকেশনস প্রাইভেসি অ্যাক্ট’ সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ব্যবহারকারীদের জন্য বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করার পাশাপাশি, অবিলম্বে এই ধরণের ডেটা পাচার বা ট্র্যাকিং বন্ধ করার জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তি বিশ্বে এআই প্ল্যাটফর্মের ডেটা সুরক্ষা নিয়ে এমন বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগে ‘পারপ্লেক্সিটি এআই’ (Perplexity AI)-এর বিরুদ্ধেও মেটা ও গুগল ট্র্যাকার ব্যবহারের অভিযোগে প্রায় একই রকম একটি মামলা হয়েছিল, যদিও পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

তবে এই গোটা মারাত্মক অভিযোগের বিষয়ে ওপেনএআই-এর পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত অফিশিয়ালি কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। চ্যাটজিপিটি-র এই নতুন আইনি লড়াই আগামী দিনে এআই প্রযুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে বলে মনে করছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা।