দিল্লির ব্রিকস বৈঠকে তুলকালাম! মুখোমুখি সংঘাতে ২ বন্ধু দেশ, যৌথ বিবৃতি আটকে যাওয়ায় চরম অস্বস্তিতে বিশ্বমঞ্চ

ভারতের সভাপতিত্বে দেশের রাজধানীতে আয়োজিত ‘ব্রিকস’ (BRICS) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের হাইপ্রোফাইল বৈঠক এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার সাক্ষী থাকল। মধ্যপ্রাচ্যের দুই মহাশক্তিধর দেশ— ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) পারস্পরিক তীব্র মতবিরোধ ও বাগ্‌বিতণ্ডার জেরে শেষ পর্যন্ত কোনো ‘যৌথ বিবৃতি’ (Joint Statement) ছাড়াই শেষ হলো এই মেগা সম্মেলন। বিশ্বমঞ্চে ব্রিকসের মতো শক্তিশালী জোটের এমন স্থবিরতা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বৈঠক শেষে স্পষ্ট জানিয়েছেন, দুই দেশের অনড় অবস্থানের কারণে কোনো সাধারণ সহমত তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত কেবল একটি ‘রাষ্ট্রপতির বিবৃতি’ (Chair’s Statement) জারি করে পরিস্থিতি সামাল দেবে।

কেন হঠাৎ রণক্ষেত্র হলো দিল্লির বৈঠক?
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কের সূত্রপাত হয় ইরান ও আমিরশাহির একে অপরের বিরুদ্ধে আনা দুটি ভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে।

ইরান চেয়েছিল, সম্প্রতি তাদের দেশের ওপর হওয়া মার্কিন ও বিদেশি হামলার নিন্দা জানিয়ে ব্রিকসের মঞ্চ থেকে একটি কড়া যৌথ বিবৃতি জারি করা হোক। ইরানি কূটনীতিকদের দাবি, ব্রিকসের বাকি সদস্য দেশগুলো এই প্রস্তাবে রাজি থাকলেও শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। আমিরশাহির চরম আপত্তির কারণেই আমেরিকার নিন্দা করে কোনো প্রস্তাব পাস করা যায়নি।

পাল্টা চাল চালতে ছাড়েনি আমিরশাহিও। তাদের দাবি ছিল, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-তে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হওয়া হামলার জন্য ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করুক ব্রিকস। ওআইসি বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশের এমন মুখোমুখি সংঘাতের জেরে বাকি দেশগুলো কার্যত অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

ইসরায়েল যোগসূত্র ও রাশিয়ার বিস্ফোরক দাবি
বৈঠকের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দেয় ইরানের একটি চাঞ্চল্যকর দাবি। ইরানি প্রতিনিধিরা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের সূত্র টেনে অভিযোগ করেন, চলমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেই গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সফর করেছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। এই অভিযোগের পর দুই দেশের বৈরিতা চরমে পৌঁছায়।

এই পুরো দ্বন্দ্বে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় তুলেছে রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ সরাসরি বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এই আগ্রাসনের মূল লক্ষ্যই হলো ইরান ও তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর মধ্যে উস্কানি দেওয়া। আমিরশাহি চাইছে হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য আমরা ইরানের ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করি, কিন্তু কূটনীতি এভাবে কাজ করে না। মার্কিন হামলাই এই সংকটের মূল কারণ।”

ত্রাতা হতে পারে ভারত, মত লাভরভের
এই চরম অচলাবস্থার মধ্যে দিল্লির ভূমিকার প্রশংসা করেছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। লাভরভের মতে, ইরান এবং তার আরব বন্ধুদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করে দীর্ঘমেয়াদী মধ্যস্থতাকারী বা ‘মিডিয়েটর’ হিসেবে ভারত এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নয়াদিল্লির সাথে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশেরই সুমধুর সম্পর্ক থাকায় ভারতই এই সংকটের একমাত্র সমাধান সূত্র বের করতে সক্ষম।

জি-৭ এর চেয়েও শক্তিশালী ব্রিকস
ব্রিকস মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোট হলেও, সম্প্রতি এর পরিধি বাড়িয়ে নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে ইরান, মিশর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে।

রাশিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির (GDP) প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এই ব্রিকস গোষ্ঠী। যা উন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৭ (G7)-এর ৩০ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু ভেতরের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব যেভাবে দিল্লির বৈঠকে প্রকাশ পেল, তা আগামী দিনে এই জোটের ঐক্য নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।