স্বাধীনতার পর প্রথম! মোদী-শাহের উপস্থিতিতে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, দেখুন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা

বাংলার রাজনীতিতে আজ এক ঐতিহাসিক দিন। ৯ই মে, শনিবার—২৫শে বৈশাখের পুণ্যলগ্নে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। স্বাধীনতার পর এই প্রথম রাজ্যে গঠিত হলো ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন শুভেন্দু অধিকারী।

ব্রিগেডে নক্ষত্র সমাবেশ
শনিবারের এই মেগা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। এছাড়াও এনডিএ শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে কলকাতায় এসেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এবং হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়াব সিং সাইনিসহ শীর্ষস্তরের বিজেপি নেতৃত্ব মঞ্চ আলো করে উপস্থিত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শুভেন্দুর গেরুয়া যাত্রা
আজকের দিনটি ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী। শপথ গ্রহণের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং শুভেন্দু অধিকারী গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে শ্রদ্ধা জানান। উল্লেখ্য, এদিনের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারীকে সম্পূর্ণ গেরুয়া পোশাকে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে একই গাড়িতে করে তিনি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে জনসমুদ্র উল্লাসে ফেটে পড়ে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর শপথ ও মোদীর আশীর্বাদ
রাজ্যপাল আর. এন. রবি শুভেন্দু অধিকারীকে পদ ও গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পরই এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁকে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন।

শুভেন্দুর ক্যাবিনেট: মন্ত্রিসভায় যারা ঠাঁই পেলেন
শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি আজ আরও পাঁচজন হেভিওয়েট নেতা মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। নতুন এই সরকারে জাতি-ধর্ম-বর্ণের এক সুষম ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে:

দিলীপ ঘোষ: মেদিনীপুরের এই দাপুটে নেতা খড়গপুর থেকে জয়ী হয়ে এবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন।

অগ্নিমিত্রা পাল: আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক তথা বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পাল নারীশক্তির প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন।

অশোক কীর্তনীয়া: মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বনগাঁ উত্তরের দুইবারের বিধায়ক অশোক কীর্তনীয়া মন্ত্রী হয়েছেন।

ক্ষুদিরাম টুডু: রানিবাঁধের এই আদিবাসী নেতা তথা শিক্ষক এবার প্রথমবার জয়ী হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিলেন।

নিশীথ প্রামাণিক: কোচবিহারের দাপুটে নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী এবার রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

মমতার গড়ে বড় জয়
শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্তরণ যেন কোনো সিনেমার গল্পের মতো। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই নেতা এবার তাঁরই খাসতালুক ভবানীপুরে তাঁকে ১৫,০০০-এর বেশি ভোটে পরাজিত করে নিজের রাজনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এবং দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর—দুটি আসনেই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি আজ বাংলার মসনদে আসীন।

বিজেপির জয়যাত্রা
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসন জিতে এক অবিস্মরণীয় জয় পায়। অন্যদিকে, গতবারের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ৪ঠা মে ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আজ শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক সিলমোহর পড়ল।

বাংলার ইতিহাসে আজকের দিনটি বিজেপি কর্মীদের কাছে যেমন জয়ের উৎসব, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও এক নতুন আশার আলো। এখন দেখার, ‘শুভেন্দু যুগে’ বাংলার উন্নয়নের গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়।