মায়ের উর্দিতে লুকিয়ে ছিল এক দেবদূত! মাঝদরিয়ায় নৌকার হাল ছেড়ে স্কুলে ফিরল ১২ বছরের কিশোর

দারিদ্র্যের কশাঘাত যখন শৈশবকে নীল করে দেয়, তখন সেই অন্ধকারের মাঝে আলোর দিশারী হয়ে এলেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। মধ্যপ্রদেশের জবলপুরের বর্গি বাঁধের উত্তাল ঢেউয়ে যে ১২ বছর বয়সী নাবালক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা চালাত, খাকি উর্দির মমতায় আজ তার হাতে কলম। সমাজ যখন পুলিশের কঠোর রূপ দেখে অভ্যস্ত, তখন সাব-ইন্সপেক্টর সরিতা প্যাটেল প্রমাণ করলেন—উর্দির নিচেও একটি স্নেহময় মায়ের হৃদয় স্পন্দিত হয়।
বিসর্জন ঘাটে শুরু সেই রূপকথা
গল্পটি শুরু হয় গণেশ বিসর্জনের সময়। বর্গি ফাঁড়ির ইন-চার্জ সরিতা প্যাটেল তখন নিরাপত্তার তদারকি করছিলেন। ভিড়ের মাঝে হঠাৎ তাঁর নজর যায় ১২ বছরের একটি শিশুর দিকে, যে নিপুণভাবে নৌকার হাল ধরে বড় বড় ঢেউ সামলাচ্ছে। এত ছোট ছেলেকে এমন বিপজ্জনক কাজে দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি। কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করতেই বেরিয়ে আসে এক করুণ আখ্যান।
নৌকার হাল বনাম স্কুলের ব্যাগ
ছেলেটির নাম অভিষেক। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অভাবের টানে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাবা দিল্লিতে শ্রমিকের কাজ করেন, মা-ও কাজের খোঁজে বাইরে। দিদিমার কাছে থাকা অভিষেকের কাছে স্কুলের বেতন তো দূর, বই কেনার মতোও টাকা ছিল না। পরিবারের অন্ন জোগাতে স্কুলের ব্যাগ ফেলে সে হাতে তুলে নিয়েছিল নৌকার হাল।
অভিভাবক যখন খোদ পুলিশ অফিসার
অভিষেকের অসহায়তা দেখে সরিতা প্যাটেলের মন গলে যায়। তিনি শুধু আশ্বাস দেননি, তৎক্ষণাৎ দায়িত্ব তুলে নেন। সরিতা নিজেই বর্গি নগরের সরকারি স্কুলে গিয়ে অভিষেকের নবম শ্রেণিতে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। মা-বাবা কাছে না থাকায় স্কুলের নথিতে অভিভাবক হিসেবে সই করেন খোদ এই সাব-ইন্সপেক্টর।
নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ইউনিফর্ম, জুতো এবং বই কিনে দেন তিনি। খাকি পোশাক পরা এই ‘মায়ের’ হাত ধরেই অভিষেকের স্বপ্নগুলো ডানা মেলে।
আজ অভিষেক আর মাঝিমাল্লা নয়
ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর বলতেন, “শিক্ষা হলো সিংহীর দুধ; যে তা পান করবে, সে গর্জন করবে।” সরিতা প্যাটেলের এই মানবিক উদ্যোগের পর অভিষেক আর পিছনে ফিরে তাকায়নি। নবম ও দশম শ্রেণিতে অভাবনীয় নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে সে এখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র। আজ তার হাতে নৌকার হাল নয়, বরং নিজের ভাগ্য গড়ার কলম।
খাকি পোশাকে মানবিকতার জয়গান
পুলিশের এই ‘লেডি সিংহাম’ সরিতা প্যাটেল আজও তাঁর এই আদর্শ বজায় রেখেছেন। থানায় কোনো শিশু এলে তিনি আজও পরম মমতায় তাদের কথা শোনেন। অভিষেকের এই গল্প আমাদের শেখায় যে, সামর্থ্য থাকলে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। আইনের কঠোর রক্ষার পাশাপাশি সমাজকে সঠিক পথ দেখানোই যে প্রকৃত জনসেবা, তা আবারও প্রমাণিত হলো।