হাসপাতালেই কেটে গেল ৫ বছর! ১ কোটির বিল মকুব করে স্ত্রীকে বাড়ি ফেরানোর ঐতিহাসিক নির্দেশ আদালতের

পাঁচ বছর আগে এক অভিশপ্ত বিকেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বদলে গিয়েছিল জীবনটা। উত্তর কলকাতার এক মহিলার সেই দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং মানবিক সঙ্কটের অবসান ঘটল আজ। দীর্ঘ পাঁচ বছর বেসরকারি হাসপাতালের কেবিনে কাটানোর পর, অবশেষে আদালতের নির্দেশে ঘরে ফিরছেন তিনি। একইসঙ্গে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার বিশাল চিকিৎসা বিল মকুব করে এক নজিরবিহীন রায় দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।

ঘটনার সূত্রপাত পাঁচ বছর আগে। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা ওই মহিলা নিজেই বাইক চালাচ্ছিলেন, পিছনে বসেছিলেন তাঁর স্বামী। পথ দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। তৎক্ষণাৎ তাঁকে ইএম বাইপাসের ধারের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় এক করুণ অধ্যায়। শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং চিকিৎসার বিপুল খরচ দেখে হাসপাতাল থেকে স্ত্রীকে আর বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাননি তাঁর স্বামী।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা দিয়ে স্ত্রীকে ভর্তি করেছিলেন ওই ব্যক্তি। এরপর ইনস্যুরেন্সের ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার পর আর কোনো টাকা মেটাননি তিনি। প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করে একাধিক অস্ত্রোপচার হলেও রোগীর পরিবার তাঁকে নিয়ে যেতে অনীহা দেখায়। নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ওই মহিলার স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল আদালতকে জানায়, মহিলা বর্তমানে স্থিতিশীল এবং বাড়িতে রেখেও তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্ভব।

এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই আজ বিচারপতি রাও নির্দেশ দেন, স্বামীকে অবিলম্বে তাঁর স্ত্রীকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মানবিক দিক বিবেচনা করে আদালত ওই মহিলার ১ কোটি ৯ লাখ টাকার বকেয়া বিল মকুব করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে হাসপাতাল যদি ইনস্যুরেন্সের মাধ্যমে কোনো টাকা উদ্ধার করতে পারে, তবে সেই পথ খোলা রাখা হয়েছে।

আদালতে স্বামী অভিযোগ করেছিলেন যে, হাসপাতালের গাফিলতিতেই তাঁর স্ত্রীর অবস্থা খারাপ হয়েছে এবং বিল মেটানোর সামর্থ্য তাঁর নেই। বর্তমানে ওই মহিলা হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন এবং অন্যের সাহায্য ছাড়া স্নান বা খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন না। আদালত রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে ওই মহিলাকে একটি বিনামূল্যে হুইলচেয়ার প্রদান করতে।

তবে রায়ে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই বিল মকুবের বিষয়টি একটি বিশেষ ঘটনা হিসেবেই গণ্য হবে। একে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে অন্য কেউ যেন বিল না মেটানোর সুবিধা না নিতে পারেন, সেই বিষয়েও সতর্ক করেছেন বিচারপতি। দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েন শেষে এখন দেখার, পাঁচ বছর পর নিজের চেনা পরিবেশে ফিরে ওই মহিলা কতটা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।