‘শ্রীক্ষেত্র’ পুরী থেকে নতুন ‘জগন্নাথ ধাম’ দিঘা, সেতুবন্ধনে জুড়ছে বাঙালির দুই গন্তব্য

বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় সৈকত শহর দিঘা এতদিন প্রধানত তার সমুদ্র, বালি এবং আধুনিক পর্যটন পরিকাঠামোর জন্যই পরিচিত ছিল। কিন্তু আগামীকাল, বুধবার নবনির্মিত এক জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনের মাধ্যমে এই শহরের পরিচিতিতে যুক্ত হতে চলেছে এক নতুন আধ্যাত্মিক মাত্রা। প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং হাজার বছরের ইতিহাস ও পুণ্যভূমির মর্যাদা প্রাপ্ত পুরীর ‘শ্রীক্ষেত্র’-এর সঙ্গে এক সূত্রে বাঁধা পড়তে চলেছে আধুনিক দিঘা।
দিঘার ইতিহাস পুরীর মতো প্রাচীন বা রহস্যময় নয়। প্রায় আড়াইশো বছর আগেও এই স্থানটির বিশেষ কোনো অস্তিত্বের কথা জানা ছিল না। বাংলার প্রথম বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে প্রথম এর খোঁজ মেলে, তখন এর নাম ছিল বীরকুল। হেস্টিংস নিজেও মুগ্ধ হয়ে তাঁর স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বীরকুলকে ‘প্রাচ্যের ব্রাইটন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। প্রধানত ব্রিটিশদের আগ্রহেই এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে ১৯২০-র দশকের আগে এখানে সেভাবে জনবসতি গড়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জন ফ্রাঙ্ক স্মিথ ১৯২৩ সাল থেকে দিঘায় বসবাস শুরু করেন এবং স্বাধীনতার পর তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়কে এই এলাকায় পর্যটন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। সেই থেকেই দিঘা ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সমুদ্র এবং বিনোদন। আধ্যাত্মিকতার কোনো যোগ সেভাবে ছিল না।
অন্যদিকে, ওড়িশার পুরী তার দীর্ঘ ইতিহাস, স্থাপত্যের বিস্ময় এবং গভীর আধ্যাত্মিকতার জন্য সুপরিচিত। দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত বলে অনুমান করা হয় এই মন্দিরটি, যা ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এবং দেশের উচ্চতম মন্দিরগুলোর একটি। ‘শ্রীক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত পুরী যুগ যুগ ধরে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর প্রধান গন্তব্য। এই মন্দিরের নির্মাণ এবং ইতিহাস নিয়ে যেমন নানা মত ও বিতর্ক রয়েছে (যেমন এটি আদিতে বৌদ্ধ মন্দির ছিল কিনা), তেমনই এর অলৌকিক কাহিনি ও রহস্যও ভক্তদের আকৃষ্ট করে। শ্রীচৈতন্যদেবের পুরী আগমনের পর থেকে বাঙালির কাছে এই স্থানের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। পুরী একাধারে তীর্থক্ষেত্র এবং পর্যটন কেন্দ্র, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিকভাবে এই দুই স্থানের পরিচিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির স্থাপন একটি নতুন সংযোগ তৈরি করছে। আগামীকাল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই মন্দিরের দ্বারোদঘাটন করবেন এবং মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে। এই ঘটনার পর দিঘা শুধুমাত্র একটি সৈকত শহর বা পর্যটন কেন্দ্র থাকবে না, এটি একটি ‘জগন্নাথ ধাম’ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করবে।
বাঙালির কাছে ছুটি কাটানোর অন্যতম প্রিয় গন্তব্য হলো ‘দিপুদা’ – দিঘা, পুরী এবং দার্জিলিং। এই নতুন পরিস্থিতিতে ‘দিপুদা’-র প্রথম দুটি স্থান – দিঘা ও পুরী – এবার আধ্যাত্মিকতার এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। যারা পুরী যান তারা হয়তো এবার দিঘার নতুন মন্দিরেও আসবেন, অথবা যারা দিঘা যান তারা সেখানেও জগন্নাথ দর্শন করে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
সব মিলিয়ে, দিঘার এই রূপান্তর শহরটিকে একটি নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে। পুরী তার প্রাচীন মহিমা নিয়ে তার স্থানে থাকলেও, দিঘা এবার পর্যটনের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতাকে যুক্ত করে এক নতুন ধারার সূচনা করছে, যা পূর্ব ভারতের পর্যটন ও তীর্থযাত্রার মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দিঘা এখন আর নিছক সৈকত নয়, এটি এখন একটি উদীয়মান জগন্নাথ ধাম।